সোমবার, ২০শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
ভাইফোঁটা---

যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা

যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা

কার্তিকের শুক্ল দ্বিতীয়া তিথিতে বাংলাদেশ ও ভারতের ঘরে ঘরে পালিত হয় ভ্রাতৃদ্বিতীয়া বা ভাইফোঁটা। বোনেরা ভাইয়ের কপালে চন্দন বা দইয়ের ফোঁটা দিয়ে মিষ্টিমুখ করায়। ধান-দুর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করা হয়। উলু, শঙ্খ প্রভৃতি মঙ্গলধ্বনিতে মুখরিত হয়ে থাকে ঘর। উপহার দেওয়া-নেওয়া চলে। ভাই-বোন উভয়েই উভয়ের মঙ্গলকামনা করে।

নিত্যদিনের পারিবারিক সম্পর্ক থেকে এভাবেই প্রতিবছর বেড়ে ওঠে স্নেহ, ভালোবাসা। একঘেঁয়ে জীবনে ফিরে আসে নতুন উচ্ছ্বাস। যম মৃত্যুর দেবতা। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ চেয়ে এসেছে কীভাবে প্রিয় মানুষকে মৃত্যুর কাছ থেকে দূরে রাখা যায়। মা সন্তানের দীর্ঘায়ু কামনা করে নীলের ব্রত করেন, স্ত্রী স্বামীর দীর্ঘায়ুর জন্য শিবরাত্রির ব্রত করেন, তেমনই বোন ভাইয়ের দীর্ঘায়ু কামনা করে কপালে মাঙ্গলিক ফোঁটা দিয়ে দেয়।

ভাই ফোঁটা বা ভ্রাতৃদ্বিতয়া সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি ধর্মীয় উৎসব। এ উৎসবকে ভাইদুজ, ভাইবিজ ও ভাইটিকা নামেও অভিহিত করা হয়। মানুষ সৃষ্টির উষালগ্ন থেকেই সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে পড়ে। মানব সভ্যতার ইতিহাসের সাথে সংস্কৃতির রয়েছে এক অপূর্ব যোগসূত্র। সেখানে রয়েছে নানা বিধ আচার অনুষ্ঠান। এমনি একটি অনুষ্ঠান ভাইফোঁটা। পাঁচদিন ব্যাপী দীপাবলি উৎসবের শেষ দিন পালিত হয় ভাইফোঁটা বা ভ্রাতৃদ্বিতীয়া।

‘ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা

যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা।

যমুনা দেয় জমকে ফোঁটা

আমি দেই আমার ভাইকে ফোঁটা’।

ভাইফোঁটার দিন বোনেরা তার ভাইয়ের কপালে চন্দনের ফোঁটা পরিয়ে দেয়, কপালে তিলক দেয় এবং ভাইয়ের দীর্ঘ জীবন কামনা করে। ভাইকে মিষ্টি খাওয়ায়। ভাইও বোনকে উপহার দেয়। অনেকে ভাইয়ের মাথায় ধান দুর্বা দেয় এবং এই সময় শঙ্খ বাজানো হয় এবং নারীরা উলুধ্বনি দেয়। ভাইফোঁটা কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে কালী পূজার দুইদিন পর অনুষ্ঠিত হয়। এই উৎসবকে কেউ যম দ্বিতীয়াও বলে।

আরও পড়ুনঃ  সিরিজের সেরা ব্যাটসম্যান হলেন নাইম

ভাইফোঁটার প্রচলন নিয়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত রয়েছে। সবচেয়ে বেশি যে মতবাদ প্রচলিত আছে তা হল যম আর যমুনার কাহিনি। মত আছে দেবতা সূর্য আর তার স্ত্রী সংজ্ঞার দুই সন্তান। পুত্র যম আর কন্যা যমুনা। সূর্যের প্রবল তেজ সহ্য করতে না পেরে সংজ্ঞা পৃথিবীতে ফিরে যান। আর যাওয়ার সময় তিনি রেখে যান তার ছায়া যা কিনা হুবহু তার মতো দেখতে। যাতে সূর্যের মনে হয় যে সংজ্ঞা তার কাছেই আছে। ওদিকে ছায়া ক্রমেই নিষ্ঠুর সৎ মা হয়ে উঠে এবং সূর্যকে বশ করে যম ও যমুনাকে স্বর্গ থেকে তাড়িয়ে দেয়।

দিন অতিবাহিত হয়। এক সময় যমুনার বিয়ে হয়। বিয়ে হয়ে গেলেও ভাইয়ের জন্য যমুনার মন খারাপ হয়। ভাইয়েরও যমুনার কথা মনে পড়ে। ভাই বোনকে দেখতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। দীপাবলির দুদিন পর যম যখন দিদির বাড়ি যায় তখন দেখে দিদি যমের জন্য বড় ধরনের অভ্যর্থনার আয়োজন করেছে। যম আবেগে আপ্লুত হয়ে তখন দিদিকে বলে ভাইয়ের কাছ থেকে কী উপহার চাই তোর? যমুনা তখন তার ভাইকে বলে এই দিনটিতে পৃথিবীর সকল ভাই যেন তাদের বোন বা দিদিকে স্মরণ করে। পৃথিবীর সকল বোন যেন ভাইয়ের দীর্ঘায়ু কামনা করে এইদিনে। সেই থেকে ভাই ফোঁটার প্রচলন শুরু হয়।

অন্য একটি মতে, অত্যাচারী নরকাসুরকে যুদ্ধে পরাজিত করে শ্রীকৃষ্ণ যখন অক্ষত অবস্থায় বাড়ি ফিরে আসেন তখন শ্রীকৃষ্ণকে অক্ষত অবস্থায় দেখে আনন্দিত শুভদ্রা ভাইয়ের কপালে পবিত্র তিলক পরিয়ে দিয়েছিল। সেই থেকে ভাই ফোঁটার শুরু। ভাই ফোঁটার প্রচলন বা উদ্ভব নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু ভাই বোনের পবিত্র সম্পর্কের বুনট শক্তহাতে ধরে রাখতে বোনদের এই প্রচেষ্টা ও আন্তরিক অনুভূতি নিয়ে কোনো মতভেদ থাকতে পারে না। ভাই বোনের সম্পর্ক সুদৃঢ় করার এই রীতি টিকে থাকুক যুগ যুগ ধরে।

আরও পড়ুনঃ  বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে দর্শনার্থী কমায় আয়ে ভাটা

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন