বৃহস্পতিবার, ৩০শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

এতিমের টাকা ভাগাভাগি

এতিমের টাকা ভাগাভাগি
  • এতিমখানায় এতিম না থাকলেও আছে বরাদ্দ
  • বরাদ্দের কথা জানেই না অনেক এতিম

বর্তমান সরকারের সুদৃষ্টি শুধু উন্নয়নে নয়, পড়েছে অসহায় দুস্থ এতিম শিশুদের প্রতিও। সরকারি শিশু সদনের পাশাপাশি বে-সরকারি শিশু সদনগুলোকেও নেওয়া হয়েছে সরকারি ভাতা ভোগীদের তালিকায়। আর এসব প্রতিষ্ঠানের আওতায় প্রতিটি অসহায় দুস্থ এতিম শিশুর জন্য দেওয়া হয় প্রতি মাসে ২ হাজার টাকা। এর ধারাবাহিকতায় নওগাঁয় সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বে-সরকারি শিশু সদনগুলোতেও এ কার্যকম অব্যহত রয়েছে।

তবে বেসরকারি এতিমখানাগুলো সমাজসেবা অধিদপ্তরের সরকারি বরাদ্দের টাকা সঠিকখাতে ব্যয় করছে না। মা-বাবা থাকলেও অনেক মাদ্রাসা ছাত্রদের এতিম বলে চালিয়ে দিচ্ছে। আবার কিছু এতিমখানা চালু কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে নেই। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নানান অনিয়ম থাকলেও মানবিক কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারি বরাদ্দ দেওয়া অব্যাহত রয়েছে।

জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রমতে, তালিকা অনুযায়ী জেলার ১১টি উপজেলায় ১৬৮টি বেসরকারি এতিমখানা রয়েছে। এসব এতিমখানায় বাৎসরিক সরকারি বরাদ্দ ৮ কোটি ২৫ লাখ ৬ হাজার টাকা। এসব এতিমখানার অধিকাংশই মাদ্রাসাভিত্তিক লিল্লাহ বোর্ডিং। আর এসবে সরকারি ভাতা ভোগী এতিম রয়েছে ৩ হাজার ৪শ ৪০ জন। প্রতি মাসে তাদের ২ হাজার টাকা করে সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়।

জেলার সব থেকে বেশি এতিম ও এতিমখানা রয়েছে মহাদেবপুর উপজেলায়। কাগজে-কলমে এতিমের সংখ্যা ও সরকারি বরাদ্দ এ উপজেলায় সবচেয়ে বেশি। তবে বাস্তব চিত্র একে বারেই উল্টো। এ উপজেলায় কাগজে-কলমে ৩৪টি বে-সরকারি এতিমখানা রয়েছে। যাতে এতিম শিশুর সংখ্যা দেখানো হয়েছে ১ হাজার ১শ ৫৪জন। জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর এর তথ্যমতে ভাতা ভোগী একজন এতিম এর বিপরীতে দুজন এতিম থাকতে হবে।

মহাদেবপুর উপজেলার বাশবারিয়া বে-সরকারি শিশু সদন ও মাদ্রাসায় ২০ জন এতিমের জন্য মাসিক বরাদ্দ ৪০ হাজার টাকা। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, এতিমখানার সাইনবোর্ড টাঙানো প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ। ঘরটির মধ্যে কিছুই নেই। জানালা-দরজা ভাঙা।

আরও পড়ুনঃ  এবার ১৫ শতাংশ বাড়ল লাইটার জাহাজে ভাড়া

মোবাইল ফোনে প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মোহাম্মদ ইউসুফ আলী’র সাথে যোগাযোগ করে প্রতিষ্ঠান বন্ধের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরীক্ষা শেষে ছাত্রদের ১০দিনের ছুটি দেওয়া হয়েছে। ছাত্রসংখ্যা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার প্রতিষ্ঠানটি নতুন তাই তেমন ছাত্র এখনও ভর্তি করাতে পারেননি। তবে ৩৭ জন ছাত্র আছে। প্রতিষ্ঠানটিতে ২০ জন ভাতাভোগী এতিম থাকলেও বাস্তবে তা পাওয়া যায়নি।

সরকারি বিধিমোতাবেক প্রতি একজন ভাতাভোগী এতিম শিশুর বিপরীতে থাকতে হবে ২ জন। অর্থাৎ ২০ জন ভাতাভোগী থাকলে সেখানে থাকতে হবে ৪০ জন এতিম। কিন্তু তার প্রতিষ্ঠানে সর্বমোট ৩৭ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। যদিও এই ৩৭ জন শিক্ষার্থীর সঠিক কোনো তথ্য দিতে পারেন নি তিনি। তবুও কীভাবে ২০ জনের ভাতা পেলেন সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকতা ও স্থানীয় এমপি মহোদয়ের সুপারিশক্রমে এসব বরাদ্দ পেয়েছেন।

এ উপজেলার সবচেয়ে বেশি বরাদ্দের তালিকায় রয়েছে সফাপুর আখতার হামিদ সিদ্দিকী বেসরকারি শিশু সদন মাদ্রাসায়। এ মাদ্রাসায় ৯০ জন এতিমের জন্য মাসিক বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। খোঁজ নিয়ে দেখা যায় মাদ্রাসার কাগজে কলমে সর্বমোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২১০ জন। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। উপস্থিত শিক্ষার্থী রয়েছে ৫০ থেকে ৬০ জন।

কাগজ কলমের সাথে উপস্থিতির এত পার্থক্য হওয়ার কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠান প্রধান আব্দুল ওহায়েদ বলেন, মাদ্রাসায় আবাসিক অনাবাসিক ছাত্র রয়েছে। আবার অনেক ছাত্র ছুটিতে আছে। তাই উপস্থিতি কম। ভাতাভোগী এতিমদের বিষয়ে তিনি বলেন, তার মাদ্রাসায় ৯০ জন ভাতাভোগী শিক্ষার্থী রয়েছে। নিয়ম অনুসারে ৯০ জনের বিপরীতে এতিম শিক্ষার্থী থাকার কথা ১৮০ জন। কিন্তু তা তিনি দেখাতে পারেননি। ৎ

আরও পড়ুনঃ  ৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে সৌদি

এছাড়াও এ উপজেলার আরেকটি প্রতিষ্ঠান ঈশ্বর লক্ষিপুর মবেজ উদ্দীন বে-সরকারি শিশু সদন এখানে ভাতাভোগী এতিমের সংখ্যা ৬৫ জন। প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কাগজে কলমে ১০৭ জন। যদিও এ প্রতিষ্ঠানে এতিম থাকর কথা ১৩০ জন। বাস্তব চিত্র আরও ভায়াবহ। এমন চিত্রের সঠিক কোনো উত্তর দিতে পারেননি প্রতিষ্ঠান প্রধান। এ সময় এতিমখানার কয়েকজন শিশুছাত্রের সঙ্গে কথা বললে তারা জানায়, তাদের সবার মা-বাবা আছেন।

অপরদিকে, বদলগাছী উপজেলার খোজাগাড়ী এতিমখানা শিশু সনদ ও নূরানী মাদ্রাসায় ১৯ জন এতিমের জন্য মাসিক বরাদ্দ ৩৮ হাজার টাকা। সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, এতিমখানাতে ৩৮ জন এতিম থাকার কথা থাকলেও সেখানে ৬-৭ জন এতিম ছাত্র দেখতে পাওয়া গেছে।

এতিমদের সঠিক তথ্য দেখতে চাইলে প্রতিষ্ঠান প্রধান আতোয়ার হোসেন বলেন, এতিমখানার তালিকা ও কাগজপত্র কমিটির কাছে আছে। তার সামনেই এতিম হিসেবে দেখানো এক ছাত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তার বাবা ও মা জীবিত আছেন। অপর এক শিশু ছাত্রও তার বাবা থাকার কথা জানিয়েছে। এসময় তিনি আরও বলেন, জেলায় এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই যে প্রতিষ্ঠানে সরকারি নিয়ম সঠিকভাবে মেনে ভাতা পেয়েছে। অন্যান্য মাদ্রাসা যেভাবে ভাতা পেয়েছে তার প্রতিষ্ঠানও সেই ভাবেই পায়।

এ বিষয়ে প্রকৃত কয়েকজন এতিমের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা মাদ্রাসার আসে পাশে মানুষের বাসায় গিয়ে খাবার খেয়ে বা নিয়ে আসেন। তাদের নামে যে সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয় তা তারা জানেই না। তাহলে তাদের নামে যে মাসে খাবার বাবদ ১৬শ টাকা, চিকিৎসা বাবদ ২শ টাকা আর পোশাকের জন্য ২শ টাকা সরকারি বরাদ্দ আসে তা যায় কোথায়?

আরও পড়ুনঃ  আংকটাডের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ড. ফাহমিদা খাতুন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ব্যাক্তি জানান, এসব মাদ্রাসা ও এতিমখানার অধিকাংশ ছাত্ররা গ্রামের লোকজনের বাড়িতে লজিং থাকে। এতিমদের খাবারের বরাদ্দকৃত টাকা শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা ভাগাভাগি করে খায়।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়মানুযায়ী যেসব শর্তে বরাদ্দ আসে তার ছিটেফোঁটাও নেই বেশির ভাগ এতিমখানায়। তারপরও বিভিন্ন তদবিরে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে এতিমখানাগুলোতে। এতিমদের টাকা যাতে নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় হয় সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।

এবিষয়ে মহদেবপুর উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা রোকনুজ্জামন বলেন, আমি এ উপজেলায় নতুন আমার আগের কর্মকর্তা সব কিছু করে গেছেন আমি শুধু ভাতা প্রদান করেছি। এবিষয়ে কোনো অনিয়ম হলে তা আমি বলতে পারব না। তবে এবার আমি তদন্ত সাপেক্ষে সঠিক প্রতিবেদন প্রেরণ করবো। ইতোমধ্যে কয়েকটি এতিমখানা পরিদর্শন করেছি। কিছু অনিয়মও পেয়েছি। তা আমি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানিয়েছি।

জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক নূর মহাম্মদ বলেন, তাদের নিয়ম অনুযায়ী, যাদের মা-বাবা বা শুধু বাবা নেই তারা বরাদ্দ পাবে। এ বিষয়টি মানবিক বলে বরাদ্দ দেওয়া অব্যাহত আছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের যাচাই-বাছাইয়ের পরও বিভিন্ন সময় এমপি মহোদয়ের সুপারিশ নিয়ে আসে তখন আমাদের আর কিছু করার থাকে না। সেই তালিকাও আমাদের সংযুক্ত করতে হয়। এর পরেও সুনির্দিষ্টভাবে কোনো অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন