শনিবার, ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

খেজুরের রসে জলবায়ুর থাবা

খেজুরের রসে জলবায়ুর থাবা
  • হারিয়ে যাচ্ছে ত্রিশালের ঐতিহ্য সুস্বাদু খেজুরের রস

ময়মনসিংহ ত্রিশালের হারিয়ে যাচ্ছে আবহমান গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য সুস্বাদু খেজুরের রস। গৌরব আর ঐতিহ্যের প্রতীক মধুময় খেজুর গাছ এখন আর দেখা যাচ্ছে না বললেই চলে। দেখা মেলে না শীতের মৌসুম শুরু হতেই খেজুরের রস আহরণে ত্রিশালের ১২টি ইউনিয়নে খেজুর গাছ কাটার প্রস্তুতি নেয়া গাছিদের তোড়জোড়। এখন শুধু ক্যালেন্ডার ও ছবিতেই দেখা যায় রস আহরণে গাছিরা কোমরে দড়ির সাথে ঝুড়ি বেঁধে ধারালো দা দিয়ে নিপুণ হাতে গাছ চাঁচাছোলা ও নলি বসানোর কাজ করছে।

এখন আর চোখে পড়েনা আমিরাবাড়ি, মোক্ষপুর, মঠবাড়ি, বালিপাড়া,ধানীখোলা, ত্রিশাল ইউনিয়ন,  গ্রামবাংলার সেই দৃশ্য, তেমনি দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে খেজুরের রসও। অথচ খেজুর গাছ হারিয়ে গেলে এক সময় হারিয়ে যাবে খেজুর রসের ঐতিহ্য। আর খেজুর গাছ হারিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে- ইট ভাটার জ্বালানী হিসাবে ব্যবহারের জন্য বেপরোয়া খেজুর গাছ নিধন। এতে দিনে দিনে ত্রিশালে উপজেলা জুড়ে আশংকাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে খেজুরের গাছ।

এক সময় শীত মৌসুম এলেই ত্রিশাল উপজেলার  পল্লী অঞ্চলে গাছিদের মাঝে খেজুর গাছ কাটার ধুম পড়ে যেতো। শীত এলেই এ অঞ্চলের সর্বত্র শীত উদযাপনের নতুন আয়োজন শুরু হয়ে যেত। খেজুরের রস আহরণ ও গুড় তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে যেতেন এ অঞ্চলের গাছি ও তাদের পরিবার। শীতের সকালে বাড়ির উঠানে বসে মিষ্টি রোদের তাপ নিতে নিতে খেজুরের মিষ্টি রস যে পান করেছে, তার স্বাদ কোনও দিন সে ভুলতে পারবে না। শুধু খেজুরের রসই নয়, এর থেকে তৈরি হয় সুস্বাদু পাটালি, গুড় ও প্রাকৃতিক ভিনেগার। খেজুর গুড় বাঙ্গালীর সংস্কৃতির একটা অঙ্গ। খেজুর গুড় ছাড়া আমাদের শীতকালীন উৎসব ভাবাই যায় না।

আরও পড়ুনঃ  রিকশা চালককে হাতুড়িপেটা করলেন এলজিইডি কর্মকর্তা

শীতের দিন মানেই গ্রামাঞ্চলে খেজুর রস ও গুড়ের ম-ম গন্ধ। খেজুর রসের পিঠা ও পায়েস তো দারুণ মজাদার। এ কারণে শীত মৌসুমের শুরুতেই গ্রামাঞ্চলে খেজুর রসের ক্ষির, পায়েস ও পিঠে খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। গ্রামীণ জীবনের শীতের উৎসব শুরু হতো খেজুর গাছের রস দিয়ে। শীতের মৌসুম শুরু হতেই সারাবছর অযত্ন আর অবহেলায় বেড়ে ওঠা খেজুর গাছের কদর বেড়ে যেত। ত্রিশালের গ্রামাঞ্চলের সেই চিত্র এখন আর চোখে পড়ে না। এখন আর আগের মত খেজুরের রসও নেই, নেই সে পিঠে পায়েসও।

ত্রিশাল  সদর, আমিরাবাড়ি, মোক্ষপুর, মঠবাড়ি, বালিপাড়া, ধানীখলা ও সাখাওয়া

 সুস্বাদু এই খেজুরের রস আগুনে জ্বাল দিয়ে বানানো হতো বিভিন্ন রকমের গুড়ের পাটালি ও নালি গুড়। গাছিরা প্রতিদিন বিকেলে খেজুর গাছের সাদা অংশ পরিষ্কার করে ছোট-বড় কলসি (মাটির পাত্র) রসের জন্য বেঁধে রেখে, পরদিন সকালে কাঁচা রস সংগ্রহ করে মাটির হাড়িতে নিয়ে এসে হাট-বাজারে বিক্রি করতো। সেই সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকজন এসে খেজুর গাছ বর্গা নিয়ে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করতো। ফলে সে সময় খেজুর গাছের কদরও ছিল বেশি।

গত সপ্তাহে ত্রিশাল উপজেলার ১১ নং মোক্ষপুর গ্রামঘুরে দেখা যায়- এক গাছি খেজুর গাছের ছাল পরিস্কার করে তাতে নলি বসাচ্ছেন। এ সময় আলাপকালে গাছি মতিন মিয়া (৫০) জানায়, আগে আমাদের দারুণ কদর ছিল, মৌসুম শুরুর আগ হতেই কথাবার্তা পাকা হতো কার কটি খাজুর গাছ কাটতে হবে। কিন্তু এখন আর কেউ ডাকে না। আগের মতো তেমন খেজুর গাছও নেই, আর গ্রামের লোকেরাও তেমন খেজুর গাছের রস সংগ্রহ করতে চায় না।

আরও পড়ুনঃ  টেকনাফে ভারী অস্ত্রের শব্দ

সংস্কৃতি কর্মী লেখক এস এম মাসুদ রানা বলেন- কাঁচা রসের পায়েস খাওয়ার কথা এখনও ভুলতে পারি না। আমাদের নাতি-নাতনীরা তো আর সেই দুধচিতই, পুলি-পায়েস খেতে পায় না। তবুও ছিটেফোঁটা তাদেরও কিছু দিতে হয়। তাই যে কয়টি খেজুর গাছ আছে তা থেকেই রস, গুড়, পিঠাপুলির আয়োজন করি।

আমিরাবাড়ি চৌরাস্তা বাজারের সফল ব্যবসায়ি নাঈম ইসলাম জানায়- এক সময় এ গ্রামে  খেজুর রসের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল কিন্তু এখন গাছের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। এখন গাছ যেমন কমে গেছে, তেমনি কমে গেছে গাছির সংখ্যাও। ফলে প্রকৃতিগত সুস্বাদু সে রস এখন আর তেমন নেই। তবুও কয়েকটা গাছের পরিচর্যা করে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে চেষ্টা করে যাচ্ছি।

এ বিষয়ে উপজেলা  কৃষি কর্মকর্তা তানিয়া রহমান বলেন, যত্রতত্র ইট ভাটা গড়ে ওঠা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এবং অসাধু ইটভাটার মালিকরা অধিক মুনাফার লোভে খেজুর গাছ জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করছে। যে কারণে ত্রিশালের বিভিন্ন অঞ্চলে খেজুর গাছ কমে যাচ্ছে। আর এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে হলে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে আমাদের বেশি বেশি খেজুর গাছ রোপন করতে হবে।

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন