শুক্রবার, ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

কম্বল-ম্যাট্রেসের দখলে লেপ-তোষক বাণিজ্য

কম্বল-ম্যাট্রেসের দখলে লেপ-তোষক বাণিজ্য

কিছু দিন পরেই জেঁকে বসবে শীত। শীতের রাত মানে লেপের তাপে শান্তির নিদ্রা। তাই গরমের বিদায় জানিয়ে লেপ-তোষক বানানোর হিড়িক পড়ে যায়। অন্যান্য সময়ের তুলনায় লেপ-তোষক তৈরীতে কারিগরদের ব্যস্ততা বেড়ে যায় তুলনামূলক বেশী। ভীড় জমতে শুরু করে তুলায় তৈরী করা দোকান গুলোতে। কিন্তু এবার দেখা গেলো এর ভিন্ন চিত্র।

বুধবার সরেজমিন উপজেলার বিভিন্ন লেপ তোষকের দোকানে গিয়ে দেখা যায়, ব্যবসায়ীরা কেউ স্মার্ট ফোনের মধ্যে লুডু কেউবা আমার পুরোন গল্পে মগ্ন হয়ে সময় পার করছেন। দোকানগুলিতে নেই তেমন কোনো ভীড়। ব্যবসায়ীরা বসে বসে দিন কাটাচ্ছে, নেই কোনো কাষ্টমার। দুই একদিন পরপর বড়জোর একটা থেকে দুইটা কাষ্টমার পাওয়া যায়। তাও মাথার বাঁলিশ তৈরীর কাস্টমার। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে তুলার তৈরী লেপ-তোষকের চাহিদা। মানুষ এখন কম্বল আর ম্যাট্রেসের দিকে ঝুঁকছেন।

জানতে চাইলে লেপ-তোষক কারীগর মো. মোশারফ হোসেন জানান,  লেপ তোষাকের চাহিদা এখন আর নাই মানুষের মধ্যে। এখন কম্বল আর কমফোর্টারই ব্যবহার করে মানুষ। তুলার চাহিদা আর নাই মানুষের। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত মাত্র ২৫০ গ্রাম তুলা বিক্রি হইছে। আগের একটা সময় ১০টা ১৫টা করে লেপ বানাইতাম। এখন তো কাজই নাই। কেউ আর আগের মতো লেপ তোষক বানায় না। এখন শুধু বালিশ বানায়। সামনে শীত বাড়বে, তখন হয়তো দু একটা লেপ তোষকের অর্ডার পেতে পারি।

তিনি আরও বলেন, ২৫ বছর যাবত এ ব্যবসায় জরিত। আগে মানুষ লেপ তোষক বানানো জন্য বসে থাকতো। আর এখন কোন রকম ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে আছি। আগের মতো নাই আর আমাদের ব্যবসা। এখন সবই পাওয়া যায় মার্কেটে। গত ৫ বছর যাবত আমাদের ব্যবসার লসের দিকে যাচ্ছে। ১ দিন কাজ করলে ৪ দিন বসে থাকতে হয়। সরকার আমাদের একটা নিদ্রিষ্ট যায়গা করে দিলে আমরা আমাদের পরিবার নিয়ে সুখে থাকতে পারবো।

আরও পড়ুনঃ  দাবদাহ চলবে ২০৬০ পর্যন্ত: জাতিসংঘ

লেপ-তোষক কারিগর সনজিৎ সাহা বলেন, মানুষের হাতে এখন টাকা পয়সা নাই। দ্রব্যমূল্য যে হারে বাড়ছে, এতে মানুষ আর লেপ তোষক বানাতে চায় না। এখন তো বাজারের বিভিন্ন ধরণের আইটেম বের হয়ে গেছে। লেপ এর বদলে কম্বল কিনে, দামও কম। লেপের খরচ বেশী, কম্বলে খরচ কম। তাছারা লেপের থেকে কম্বল দেখতে সুন্দর বেশী। আগের মতো করে সেই চাহিদা নেই এখন আর। এক সময় শীত থাকতো টানা ৩ মাসেরও বেশী। এখন সেই শীত ১ মাসেই শেষ।

লেপ-তোষক কারিগররী পেশা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ঐতিহ্য পেশা। এখন শীত আসলে কারিগররা লেপ-তোষক বানাচ্ছে এমন দৃশ্য আর চোখে পড়ে না। বাহারি কম্বল আর ম্যাট্রেসের দাপটে হারিয়ে গেছে লেপ-তোষকের কদর। আর এই সময় ও রুচির মধ্যস্থতায় বিপাকে পড়েছে খেটে খাওয়া লেপ-তোষকের ব্যবসায়ী ও কারিগররা। দীর্ঘদিনের এ ব্যবসাকে না পারছে ছেড়ে দিতে না পারছে ধরে রাখতে। তাদের কারো কাছে এটা ঐতিহ্যে আবার কারোর জন্য এটাই একমাত্র উপার্জনের উৎস।

কাঁচপুর এলাকার এক লেপ-তোষক কারিগর জানান, লেপ-তোষকের কারিগর আমার দাদা ছিলেন, আমার বাবা ছিলেন এখন ৬০ বছর যাবত আমি করছি। আগের মতো করে এখন আর সেই ব্যবসা আমাদের নেই বলা যায়। এখন কম্বল আর ম্যাট্রেসের কারণে আমাদের ব্যবসা অনেকটা নাজেহাল অবস্থা। এখন আর কেউ শিমুল তুলার বালিশ তৈরী করতে আসে না সবাই ফোমের বালিশ কিনে। তুলার তোষক আর কেউ চায় না ফোমের তোষক কিনে। এখন রেডিমেট এর চাহিদা বেশী । লেপের পরিবর্তে কম্বল কিনে মানুষ। এতে করে আমাদের ব্যবসা লসের দিকে। অনেকে লসের কারণে এই পেশা ছেড়ে দিচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্য। ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে এই পেশার কারিগর।

আরও পড়ুনঃ  রুম্পা হত্যাকান্ডে সৈকতের চার দিনের রিমান্ড

লেপ-তোষাকের বাজারে দেখা যায়, এ বছর একটি লেপ তৈরি করতে ১৩শ টাকা থেকে ১৫শত টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। তোষক বানাতে খরচ পড়ছে ১ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা।

লেপ-তোষক ব্যবসায়ী হীরা জানান, এখনো শীত নামে নাই। গ্রাম সাইডে বেচাকেনা মোটামুটি থাকলেও শহরে এর বেচাকেনা খুবই কম। দাম বাড়ায় আগের থেকে অনেক খারাপ সময় যাচ্ছে আমাদের। আগে আট নিতাম ৩০-৪০টাকা কেজী। আর এখন ৬০-৭০ টাকা কেজি। যেখানে মানুষ সংসার চালাতে হিমশিম খায়, সেখানে লেপ তোষক কিভাবে বানায়।

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন