সোমবার, ১৭ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বালু ব্যবসার বলি ব্রহ্মপুত্র

বালু ব্যবসার বলি ব্রহ্মপুত্র

শুকনো মৌসুমে ব্রহ্মপুত্র নদ অনেকটা শান্ত থাকায় অসাধু বালু ব্যবসায়ীদের অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মহোৎসব শুরু হয়েছে। বালু পরিবহনের সুবিধায় তারা নদের পানি প্রবাহ বন্ধ করে বুকে সড়ক নির্মাণ করেছেন। কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার যাদুরচর ইউনিয়নের কর্তিমারী নৌকাঘাটে এমন চিত্র দেখা গেছে। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি প্রবাহ বন্ধ করে সেখানে প্রায় দুশ মিটার দীর্ঘ সড়ক নির্মাণ করছে স্থানীয় বালু ব্যবসায়ী ও ট্রাক্টর মালিকরা। চরের ফসল পারাপারের অজুহাত দেখিয়ে তারা নদ থেকে উত্তোলন করা বালু পরিবহনে তারা সেই সড়ক ব্যবহার করছে। এমন অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।

কর্তিমারী খেয়া ঘাটের ইজারাদার আব্দুল্লাহ আল মামুন অভিযোগ করেন, যাদুরচর ইউনিয়ন ট্রাক্টর (কাঁকড়া গাড়ি) মালিক সমিতির সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জাহিদ, সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমানসহ ৪০টি ট্রাক্টরের মালিক নিজেদের অর্থ ব্যয় করে ব্রহ্মপুত্র নদে রাস্তা নির্মাণ করছেন। তিনি আরো অভিযোগ করেন, গত বছরের শুরুতে তারা একই কৌশলে ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে সেই বালু পরিবহনের জন্য রাস্তা নির্মাণ করেছিলেন। পরে বন্যায় সে রাস্তা ভেঙে যায়। এবারও তারা একই কাজ করছেন। তবে স্থানীয় প্রশাসনকে জানানোর পরই কোনো প্রতিকার মেলেনি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নদ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় প্রতিবছর বর্ষার সময় নদের তীরবর্তী এলাকায় ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয়। অনেকের বসতভিটা, ফসলিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। গেল বছরেও ওই এলাকায় শতাধিক পরিবার নদের ভাঙনে বাস্তুহারা হয়েছে। কর্তিমারী নৌ ঘাট এলাকায় গিয়ে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। দেখা যায়, ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে রাস্তা নির্মাণ কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন ট্রাক্টর মালিক ও তাদের শ্রমিকরা। কয়েকটি ট্রাক্টর দিয়ে চর থেকে বালু এনে নদের পানি প্রবাহ বন্ধ করে রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রভাবশালী এসব বালু ব্যবসায়ী ও ট্রাক্টর মালিকদের ভয়ে প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলতে সাহস করছেন না।

আরও পড়ুনঃ  ধর্ষণের বিরুদ্ধে আর চুপ থাকতে পারি না: মুশফিক

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভাঙনের শিকার স্থানীয় কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, প্রতিবছর ড্রেজার মেশিন আর ট্রাক্টরে করে নদ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় বন্যার সময় ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয়। এমন ভাঙনে গত বছর বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে নদতীরবর্তী দেড় শতাধিক পরিবার। এছাড়াও নদের ভাঙনে বেড়িবাঁধের (চাক্তাবাড়ি-ধনারচর-রাজিবপুর বেঁড়িবাঁধ) একাংশ, মসজিদসহ কয়েকশ হেক্টর ফসলিজমি বিলীন হয়ে গেছে। তবে বেপরোয়া বালু ব্যবসয়ীদের কোনোভাবেই থামনো যাচ্ছে না। নদ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি জানান স্থানীয়রা।

ব্রহ্মপুত্রের বুকে রাস্তা নির্মাণের কথা স্বীকার করে রৌমারী উপজেলার যাদুরচর ইউনিয়ন ট্রাক্টর মালিক সমিতির সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দিগলাপাড়ার সব জমাজমি চরে। আমরা যেমন বালু আনবো (উত্তোলন) তেমনি আমাদের ফসলাদিও আনা দরকার। এ জন্য রাস্তাটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এটা নিজেদের অর্থেই নির্মাণ করা হচ্ছে। বালু উত্তোলনই মূল উদ্দেশ্য কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাক্টর মালিক সমিতির সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, ‘হ্যাঁ, বালু তো কাটবোই, এটা আমাদের ব্যবসা।

রৌমারীর অনেক স্থানেই নদ-নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে জানিয়ে রেল-নৌ যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটি, রৌমারী উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শাহ আব্দুল মোমেন বলেন, এ উপজেলা অবৈধ বালু ব্যবসায়ীদের স্বর্গরাজ্য। প্রশাসন সব কিছু জানার পরও বেশিরভাগ সময় নীরব থাকে। নদীভাঙনে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগকেও তারা আমলে নেয় না। নদের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করাসহ এসব অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের জোর দাবি জানাচ্ছি।

আরও পড়ুনঃ  তিন ধাপে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পরিকল্পনা

কর্তিমারী খেয়া ঘাটের ইজারাদার আব্দুল্লাহ আল মামুন আরও জানান, তিনি যাদুরচর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কর্তিমারী নৌকা ঘাটটি এক লাখ বিশ হাজার টাকায় এক বছরের জন্য লিজ নিয়েছেন। ওই নৌকা ঘাটে ব্রহ্মপুত্র নদে রাস্তাটি নির্মাণ করায় খেয়ার নৌকা চলাচলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে আর্থিকভাবে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) উত্তরাঞ্চলের সমন্বয়কারী তন্ময় সান্যাল বলেন, বালুমহাল ছাড়া বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী বিপণনের উদ্দেশ্যে কোনও আবাসিক এলাকার এক কিলোমিটারের মধ্যে উন্মুক্ত স্থান বা নদীর তলদেশ হতে বালু বা মাটি উত্তোলন নিষিদ্ধ। একই আইনে বালু বা মাটি উত্তোলন ও বিপণনের উদ্দেশ্যে ড্রেজিংয়ের ফলে কোনও নদীর তীর ভাঙনের শিকার হতে পারে, এরূপ ক্ষেত্রে বালু বা মাটি উত্তোলন নিষিদ্ধ। এসব অপরাধে অনূর্ধ্ব দুই বছরের কারাদণ্ড ও সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়ার বিধান রয়েছে।

উল্লেখ্য, কুড়িগ্রামে কোনও বালুমহাল নেই। তবে বছরজুড়েই এ জেলার প্রায় প্রতিটি নদ-নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রির মহোৎসব চলে। অপরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের ফলে সৃষ্ট নদীভাঙনে শত শত পরিবার বাস্তুহারা হলেও অবৈধ এই কাজ বন্ধে স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। মাঝে মাঝে দায়সারা কিছু অভিযান পরিচালিত হলেও নদ-নদী অববাহিকায় বালু লুটের চিত্র অপরিবর্তিতই থাকে।

জানতে চাইলে রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল ইমরান বলেন, বিষয়টি জানার পরপরই সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের তহশীলদারকে পাঠিয়ে নদের বুকে সড়ক নির্মাণ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছি। এরপরও এমন কাজ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন