সোমবার, ১৭ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্তের সংখ্যাই বেশি

করোনা শনাক্ত ১১ হাজার ছুঁইছুঁই

দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের রোগীর সংখ্যাই বেশি বলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) গবেষণায় জানানো হয়েছে।

২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর থেকে এ বছরের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত গত এক বছরের সংগৃহীত স্যাম্পলের ৮০ শতাংশে ডেল্টা ও ২০ শতাংশের ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গতকাল মঙ্গলবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এই তথ্য জানানো হয়। 

বিএসএমএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো শারফুদ্দিন আহমদ বলেন, মোট ৯৬টি নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিং করা হয়, যার মধ্যে ৯টি (২০%)-তে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া যায়। বেশিরভাগ লোকের দেহেই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের কারো মধ্যেই ওমিক্রন ছিল না। তবে আউটডোর ইউনিটের রোগীদের কাছ থেকে সংগৃহীত স্যাম্পলে ওমিক্রন পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ওমিক্রন দেশে গুণিতক আকারে বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। (উল্লেখ্য, ২ অঙ্ক থেকে গুণিতক আকারে ২, ৪, ৬, ৮ এভাবে বৃদ্ধি পায়। আবার ৩ অঙ্ক থেকে গুণিতক আকারে ৩, ৯, ১২, ১৮ এভাবে বৃদ্ধি পায়)।

বিএসএমএমইউ উপাচার্য জানান, তাদের সংগৃহীত নমুনা জিনোম সিকোয়েন্সিং বিশ্লেষণ গবেষণায় ২০২১ সালের জুলাই মাসে দেখা যায়, মোট সংক্রমণের প্রায় ৯৮ শতাংশ হচ্ছে ইন্ডিয়ান বা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে, আর ১ শতাংশ সাউথ আফ্রিকান বা বেটা ভ্যারিয়েন্টে। ১ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে তারা পেয়েছেন মরিসাস বা নাইজেরিয়ান ভ্যারিয়েন্ট।

শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ২০২১ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত জিনোম সিকোয়েন্সে পাওয়া ডাটা অনুযায়ী, ৯৯ দশমিক ৩১ শতাংশ ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট, একটি করে ভ্যারিয়েন্ট অব কনসার্ন আলফা বা ইউকে ভ্যারিয়েন্ট এবং বেটা বা সাউথ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট এবং অন্য একটি স্যাম্পল-এ শনাক্ত হয় টুয়েন্টি-বি ভ্যারিয়েন্ট, যা একটি ভ্যারিয়েন্ট অব ইন্টারেস্ট। গত ৮ ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সংগৃহীত ৪০টি নমুনার ৮টিতে ২০ শতাংশই ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট এবং ৮০ শতাংশ ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া যায়। পরের মাসে এই ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট গুণিতক হারে বৃদ্ধির আশঙ্কা করা যাচ্ছে। প্রকৃত ফল আমরা এ মাসেই আপনাদের জানাতে পারবো।

আরও পড়ুনঃ  সংক্রামক রোগগুলো কোনো সীমানা জানে না: প্রধানমন্ত্রী

উপাচার্য জানান, এই রিপোর্ট বিএসএমএমইউ’র চলমান গবেষণার ৬ মাস ১৫ দিনের ফল। আমরা আশা করি, পরের সপ্তাহগুলোতে চলমান হালনাগাদ করা ফল জানাতে পারবো।

গবেষকরা জানান, ২০২১ সালের ২৯ জুন থেকে এ বছরের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত কোভিড-১৯ আক্রান্ত সারা দেশের রোগীদের ওপর এই গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষণায় দেশের সব বিভাগের রিপ্রেজেন্টেটিভ স্যাম্পলিং করা হয়। গবেষণায় মোট ৭৬৯ কোডিড-১৯ পজিটিভ রোগীর ন্যাযোফ্যারিনজিয়াল সোয়াব স্যাম্পল থেকে নেক্সট জেনারেশন সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে করোনাভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং করা হয়।

বিএসএমএমইউ’র গবেষণায় ৯ মাস থেকে শুরু করে ১০ বছর বয়সী রোগী অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এরমধ্যে ২১ থেকে ৫৮ বছর বয়সের রোগীদের সংখ্যা বেশি। যেহেতু কোনও বয়সসীমাকেই কোভিড ১৯-এর জন্য ইমিউন করছে না, সে হিসেবে শিশুদের মধ্যেও কোভিড সংক্রমণ রয়েছে। গবেষণায় আরও পাওয়া গেছে, কোভিড আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে যাদের কো-মরবিডিটি রয়েছে, যেমন: ক্যানসার, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস তাদের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। পাশাপাশি ষাটোর্ধ্ব বয়সী রোগীদের দ্বিতীয়বার সংক্রমণ হলে সে ক্ষেত্রে মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে।

উপাচার্য বলেন, ডেলটা ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট অনেক বেশি সংক্রমিত হচ্ছে বলে প্রতীয়মান। ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট ভাইরাসের জেনেটিক কোডে ডেলটা ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে বেশি ডিলিশন মিউটেশন পাওয়া গেছে, যার বেশিরভাগে ভাইরাসটির স্পাইক প্রোটিন রয়েছে। এই স্পাইক প্রোটিনের ওপর ভিত্তি করে বেশিরভাগ ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়। স্পাইক প্রোটিনের বদলের জন্যই প্রচলিত ভ্যাকসিনেশনের পরেও ওমিক্রন সংক্রমণের সম্ভাবনা থেকে যায়।

আরও পড়ুনঃ  ছাত্রলীগের উদ্যোগে কক্সবাজারে ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালের যাত্রা শুরু

তিনি জানান, আমাদের জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে কোনও কোনও ওমিক্রন আক্রান্ত রোগীর দুই ডোজ ভ্যাকসিন দেওয়া ছিল। তা ছাড়া গবেষণায় তৃতীয়বারের মতো সংক্রমিত হওয়া রোগী পাওয়া গেছে। হাসপাতালে ভর্তি রোগী থেকে সংগৃহীত স্যাম্পলে জিনোম সিকোয়েন্স করে ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গেছে। যেহেতু ওমিক্রন সংক্রমণে মৃদু উপসর্গ হয়েছে, তাই হাসপাতালে ভর্তি রোগীতে ওমিক্রন না পাওয়ার কারণ হতে পারে। পাশাপাশি মৃদু উপসর্গের রোগীদের মধ্যে টেস্ট না করার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। তাই আমাদের প্রাপ্ত ফলাফলের চেয়েও অনেক বেশি ওমিক্রন আক্রান্ত রোগী শনাক্তের বাইরে আছে বলে মনে করছি।

এ সময় প্রধান গবেষক জেনেটিক্স অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ও অ্যানাটমি বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. লায়লা আনজুমান বানু উপস্থিত ছিলেন।

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন