বুধবার, ১০ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ২৭শে চৈত্র, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

বিলে গরু-মহিষের বাথান, লাভবান কৃষক

বিলে গরু-মহিষের বাথান, লাভবান কৃষক

একদিকে তিতাস নদী, অন্যদিকে রয়েছে কাজলা বিল। ওই বিশাল এলাকাজুড়ে রয়েছে কৃষি জমি আর অনাবাদি জমি। যা সবুজে সমারোহ। যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ চোখে পড়ে। বিলে নিরাপদ প্রাকৃতিক গো-খাদ্যের সুবিধা থাকায় কৃষকরা গবাদিপশু পালন করছে। সেইসাথে গড়ে উঠেছে একাধিক বাথানও। কেউ কেউ সকাল বেলা তাদের গবাদিপশু নিয়ে পানি ভিজে ছুটে চলেন বিলের মধ্যে প্রাকৃতিক ঘাসের সন্ধানে। আবার ফিরছেন বিকালে। কেউবা বিলের মধ্যে বাথান বা খামার করে ওইসব পালন করছে।

তবে দূর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে ওই জায়গাতে গবাদিপশু পালন হচ্ছে। কিন্ত ভেতরে অগ্রসর হতেই দেখা মিলে সারিবদ্ধ গরু, মহিষ ভেড়া আর হাঁসের। এমন এক মনোমুদ্ধকর গ্রাম বাংলার দৃশ্য চোখে পড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিজয়নগরের সিঙ্গারবিল এলাকার কাজলা বিলে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিজয়নগর উপজেলার সিঙ্গারবিল সংলগ্ন কাজলা বিল নামে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে কৃষি মাঠ রয়েছে। এই মাঠে কৃষকরা ধানসহ অন্যান্য কৃষি করলেও অনাবাদি জমিও রয়েছে বেশ। বিল সংলগ্ন চারদিকে রয়েছে শুধু প্রাকৃতিক ঘাস। যা গরু মহিষ, ভেড়ার জন্য খুবই উপযোগী।

কাজলা বিলে প্রাকৃতিক ঘাস থাকায় আখাউড়া উপজেলার উত্তর ইউনিয়ন ও সদর উপজেলার বিজয়নগরের বেশ কয়েকটি গ্রামের লোকজন বানিজ্যিক ভাবে গরু, মহিষ, ভেড়া, হাঁস পালন করছে। তাছাড়া এই বিশাল বিলে একাধিক বাথান ও রয়েছে। বাথানে কৃষকরা সংঘবদ্ধ হয়ে গরু মহিষ ভেড়া পালন করে তারা লাভবান হচ্ছেন।

একাধিক কৃষক বলেন কাজলা বিলে প্রাকৃতিক ঘাস থাকায় পশু পালনে খাবারের জন্য তাদের বাড়তি কোন টাকা খরচ করতে হয় না। বিলের প্রাকৃতিক সবুজ ঘাসে গবাদি পশুগুলো হৃষ্ট পুষ্ট হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে ৩ মাস বাথানসহ স্থানীয় লোকজনরা তাদের গরু-মহিষগুলো নিজ বাড়িতে পালন করেন। শুষ্ক মৌসুমে কাজলা বিলের প্রাকৃতিক ঘাস খেয়ে ওইসব গবাদিপশুগুলো পালন করছেন।

আরও পড়ুনঃ  পর্যটন মানচিত্রের বদল

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল হতেই লোকজন গরু মহিষ নিয়ে প্রাকৃতিক ঘাস খাওয়াতে ছুটে চলছেন তিতাস পাড়ি দিয়ে কাজলা বিলে। তাছাড়া বিলে গড়ে উঠা ঘরে বাথানে রাখা গরু মহিষগুলো ঘাস খাওয়াতে নিয়ে যাচ্ছেন খামারিরা। সব মিলিয়ে ওইসব পালনে ব্যস্ত সময় তারা পার করছেন। কৃষকদের নাওয়া খাওয়া বিলের মধ্যেই হয়ে থাকে।

কথা হয় আখাউড়া উপজেলার উত্তর ইউনিয়নের আমোদাবাদ গ্রামের মো: সালমান মিয়ার সাথে। তিনি বলেন দীর্ঘ ৮ বছর ধরে বিলের মধ্যে বাথানে গরু-মহিষ, ভেড়া আর হাঁস পালন করছেন। ওইসব পালনে তারা ৮ জন রয়েছেন। এরমধ্যে তাদের বাথানে গরু আছে মাঝারি ও বড় আকারের ৩৬টি, মহিষ ৭টি ভেড়া ২০টি এবং হাঁস রয়েছে ৬০০টি। আসলে মূলত এখানে প্রাকৃতিক ঘাস থাকায় গরু মহিষ ভেড়া পালন করছি। ওইসব পালনে আমাদের কোন বাড়তি কোন খরচ হয়না। ঈদ উপলক্ষে গরু মহিষ বিক্রি করা হবে। তিনি আরও বলেন এখানে আমরা ঘাসও চাষ করি। প্রাকৃতিক ঘাসের কোন অভাব না থাকায় বাড়তি খাবারের চিন্তা করতে হয় না ।

ফলে ওই সব পালনে বিক্রিতে ভালো টাকা আয় হয়। বর্ষা মৌসুমে গরুগুলো বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় । আর শুষ্ক মৌসুমে বিলের মধ্যে অবস্থান করি। এখানেই দিন রাত আমাদের থাকতে হয়। খাওয়া দাওয়া আর ঘুমানোর এখানেই করতে হয়। গরু মহিষের গোসল করাতে সোজা তিতাস নদীতে যাওয়া হয়। তাছাড়া গরু মহিষের নানা রোগবালাই হলে বাজারে এসে ফার্মেসির লোকজনের সাথে কথা বলে ঔষধ কেনা হয়। স্থানীয় প্রাণীসম্পদ বিভাগের লোকজনকে ডাকলেও তারা খুব একটা আসতে চান না।

আরও পড়ুনঃ  সিনহা হত্যা: তদন্ত শেষ পর্যায়ে, গণশুনানী শেষে তদন্ত কমিটির প্রধান

আমোদাবাদ গ্রামের হোসেন মিয়া বলেন, আমাদের গ্রামের অনেক পরিবার কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অনেক লোকজন বাড়িতে গরু মহিষ পালন করছেন। আমার ৫টি গরু রয়েছে। গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় শুধু প্রাকৃতিক ঘাস খাওয়াচ্ছি। সকালে লোক দিয়ে কাজলা বিলে পাঠানো হয়। বিকাল হলে ওই জায়গা থেকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। গরু পালনে বাড়তি কোন খরচ নেই বলে চলে। মো: বাদশা মিয়া বলেন গরু ও মহিষের সংখ্যা বেশী হওয়ায় বিলের মধ্যে ঘর করে পালন করছি। সকাল হলে বিলের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয়। আমরাও প্রতি মুহুর্তে নজর রাখছি। প্রাকৃতিক ঘাস না থাকলে গো-খাদ্য কিনে ওইসব পালন করা সম্ভব হতো না। প্রাকৃতিক ঘাস খাওয়ার ফলে এসব পালনে বেশ লাভবান হচ্ছি।

সিঙ্গার বিল এলাকার মুর্শেদ মিয়া বলেন, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে ১৫ টি মাঝারি আকারের গরু পালন করছি। খাবারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বাড়িতে রেখে গরু পালন করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই এখন গরু পালনে প্রাকৃতিক ঘাসের উপর নির্ভর করছি। তাই প্রতিদিন সকালে বাড়ি সংলগ্ন বিলে গরুগুলোকে নিয়ে যাওয়া হয়। আর বিকাল হলে দল বেধে বাড়িতে আনা হয়। বাড়িতে বাড়তি কোন খাবার খাওয়ানো হয় না। প্রাকৃতিক ঘাস খাওয়ার কারণে দৈনিক ৫শ-৬শ টাকার উপর বেচে যাচ্ছে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাক্তার জুয়েল মজুমদার বলেন, অনুকূল পরিবেশ ও বাজারে মাংসের প্রচুর চাহিদা থাকায় গবাদিপশু পালন দিন দিন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। আমরা খামারিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। তাছাড়া গবাদিপশুর রোগবালাই দমনে খোঁজখবর রাখা হয় বলে জানায়।

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন