শুক্রবার, ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

শিশু শ্রমিক কেনাবেচা

শিশু শ্রমিক কেনাবেচা

স্বল্প মজুরিতে কাজ বেশি তাই শিশু শ্রমিকদের কদরও বেশি। চলনবিলাঞ্চলের নয়াবাজার শ্রমিকের হাটসহ বিভিন্ন হাট ঘুরে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। হাটজুড়ে শুধু মানুষ আর মানুষ। তবে এ হাটে কোনো পণ্য বিক্রি হয় না, শুধু বিক্রি হয় মানুষের শ্রম। নাটোরের গুরুদাসপুরের ধারাবারিষা ইউনিয়নের নয়াবাজারসহ অনেকগুলো শ্রমিকের ভ্রাম্যমাণ হাট গড়ে উঠেছে। শ্রমিকের এ হাটের বয়স প্রায় কুড়ি বছর।

কার্তিক অগ্রহায়ণে চলনবিল জুড়েই শুরু হয় আমন ধান কাটা আর রসুন রোপণের কাজ। তাই কৃষক ও শ্রমিকরা নিজেদের প্রয়োজনেই ছুটে আসেন শ্রমিকের হাটে। সেখানে মালিকরা শ্রমিকদের দরদাম শেষে চুক্তিবদ্ধ করে নিয়ে যান নিজেদের কাজে। মালিকরা ইচ্ছেমতো ক্রয় করতে পারেন শ্রমিক। কারণ হাজারো শ্রমিক দেশের নানা প্রান্ত থেকে শ্রম বিক্রি করতে আসেন চলনবিল অধ্যুষিত ওই হাটগুলোতে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের আকাশ ছোঁয়া দামে নিম্ন ও মধ্যবৃত্তের মানুষগুলো বড্ড অসহায় হয়ে পড়েছে। নিজেদের জীবন-জীবিকার তাগিদেই এসেছেন শ্রম বিক্রি করতে। কেউ স্বামী হারা অসহায় নারী শ্রমিক, কেউ বা আবার বাপ-মাহারা অনাথ শিশু। বৃদ্ধরাও রয়েছেন এসব দলে।

গুরুদাসপুর উপজেলার ধারাবারিষা গ্রামের কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, অপেক্ষাকৃত তরুণ-তরুণীদের মজুরি কম অথচ কাজে গতি বেশি হওয়ায় ৫ জন তরুণ কৃষি শ্রমিক নিলাম। প্রতিদিন মজুরি হিসেবে দিতে হবে ২৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা। এ বছর ৮ বিঘা জমিতে রসুন লাগিয়েছি। যখন প্রয়োজন হয় তখন নয়াবাজার শ্রমিক হাট থেকেই শ্রমিক নিয়ে যাই।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিন ভোর রাত থেকে শ্রমিক আর গৃহস্থদের আনাগোনা শুরু হয়। সকাল ৯টার মধ্যেই আবার হাট ভেঙে যায়। কুয়াশা উপেক্ষা করে ভোর থেকে বাসের ছাদ, ট্রাক ও ইঞ্জিনচালিত নছিমন-করিমনে করে দল বেঁধে শ্রমিকেরা কাজের সন্ধানে আসেন। হাট শুরু হলেও বয়স্ক শ্রমিকদের কদর কম হওয়ায় সকাল ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে দেখা যায়। ভাগ্য সহায় হলে কম মূল্যেই যেতে হয় মালিকের বাড়িতে। আর না হলে ফিরে যেতে হয় নিরাশ হয়ে। এ সবের কারণে অনেক বৃদ্ধ শ্রমিকের কপালে চিন্তার ভাঁজও দেখা যায়।

আরও পড়ুনঃ  চা শ্রমিকদের ফাগুয়া উৎসব

কৃষকের চাহিদা অনুসারে উপজেলার কাছিকাটা, হাজিরহাট, নয়াবাজার, তাড়াশ ও বড়াইগ্রামের কিছু পয়েন্টে নেমে পড়েন এই শ্রমিকেরা। দরদাম করে মজুরি নির্ধারণ করে চাহিদামতো শ্রমিক নিয়ে যান কৃষকেরা।

পাবনার ভাঙ্গুরা থেকে আসা বেশ কয়েকজন শ্রমিকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী একজন পুরুষ শ্রমিক গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পান। তবে একজন নারী শ্রমিকরা কম মজুরি পান ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। শিশু শ্রমিকরা পান ২০০ থেকে ৩০০টাকা।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও নওগাঁ থেকে আসা কয়েকজন শ্রমিক জানান, ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া দিয়ে তাঁরা কাজের আশায় এ হাটে আসেন। কারণ, কাজ পেলেই ওই দিন তাদের দুবেলা খাবার জোটে কাজ না পেলে অনাহারে অর্ধাহারে কাটে দিন।

অনামিকা দাস নামের এক নারী শ্রমিক বলেন, তাঁর স্বামীও দিনমজুর ছিলেন। তবে স্বামী অসুস্থ হওয়ায় তাঁর কাঁধেই এখন পুরো সংসারের দায়িত্ব। তার সঙ্গে ওই গ্রামের আরও ১০ নারী শ্রমিক এসেছেন কাজের সন্ধানে। কিন্তু পুরুষ শ্রমিকের সমান কাজ করলেও মজুরি অর্ধেক।

শ্রমিক নেতা দুলাল শেখ বলেন, বছরের এ সময় সাধারণত অনেক এলাকায় কাজ থাকে না। ফলে স্বল্প আয়ের মানুষেরা মিলে দল গঠন করে এ হাটে আসেন তারা।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে স্থানীয় শ্রমিকদের দিয়েই আমন ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ হতো। ২০০৫ সালের দিকে চলনবিলজুড়ে বিনা হালে রসুনের আবাদ শুরু হলে বাড়তি শ্রমিকের চাহিদা দেখা দেয়।

আরও পড়ুনঃ  নানামুখী সংকটে ব্যাহত চাষাবাদ

এদিকে, চলনবিলে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, উল্লাপাড়া, রায়গঞ্জ, নওগাঁ,পাবনার চাটমোহর ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলাসহ দেশের নানাপ্রান্ত থেকে এসব হাটে শ্রমজীবী মানুষ দল বেঁধে আসেন শ্রম বিক্রি করতে। এবছর হাটে প্রচুর শ্রমিক থাকায় সহজেই শ্রমিক পাচ্ছি।

ধারাবারিষা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মতিন বলেন, দীর্ঘ কুড়ি বছর যাবত তাঁর ইউনিয়নের নয়াবাজারে শ্রমিকের হাট বসছে। ধান কাটা ও রসুন রোপণের সময় এ হাটে প্রতিদিন কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ হাজার শ্রমিকের সমাগম ঘটে। যা চলনবিলের নানাপ্রান্তে চলে যায় কাজ করতে। দিন শেষে আবার আপন কুলোয় চলে যায়।

আনন্দবাজার/শহক

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন