রবিবার, ২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১২ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

খনন-কূপে নতুন সম্ভাবনা

খনন-কূপে নতুন সম্ভাবনা

করোনা মহামারী পরবর্তীতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। সম্ভাব্য মহামন্দা বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে জাতিসংঘ। আর মহামন্দায় সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে জ্বালানি সরবরাহে। বিশেষত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর গত কয়েক মাসে জ্বালানির বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে যার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। আমদানিনির্ভরতার কারণে দেশে অন্যতম প্রধান জ্বালানি গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

এদিকে, সংকটের কারণে দফায় দফায় জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা বলছে, বৈশ্বিক সংকট, উৎপাদনে ঘাটতি এবং মজুদ সংকটে বাড়ছে জ্বালানির দাম। তবে তীব্র সংকটের মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছে দেশের পরিত্যক্ত গ্যাস ক্ষেত্রগুলো। দেশের অভ্যন্তরীণ পরিত্যক্ত গ্যাস কূপে নতুন খননে গ্যাসের দেখা মিলছে। সম্প্রতি বিয়ানীবাজারের গ্যাসক্ষেত্রের পরিত্যক্ত কূপে মিলছে গ্যাস। আর তার আগে ভোলায় টবগী-১ অনুসন্ধান কূপেও গ্যাসের সন্ধান মিলেছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকটের মধ্যে গ্যাসের সন্ধান নতুন করে সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। পরিত্যক্ত আরও কূপে অনুসন্ধান আর নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার করা গেলে সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। ক্রমাগত বৈশ্বিক সংকট আর জ্বালানির উচ্চমূল্যের বাজারে গ্যাসের নতুন আবিষ্কার আর পরিত্যক্ত কূপে গ্যাস প্রাপ্তি অনেকটা আশীর্বাদের মতো।

সূত্রমতে, দেশে বর্তমানে আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রের মোট সংখ্যা ২৮টি। এসব গ্যাসক্ষেত্রে প্রমাণিত মজুতের পরিমাণ ২১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন বর্গফুট (টিসিএফ)। এছাড়াও ৬ টিসিএফ রয়েছে সম্ভাব্য মজুত। অপরদিকে খনন করা ৭০টি কূপের বেশিরভাগেরই উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। আগে যেখানে দৈনিক উৎপাদন হতো ১১৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট, এখন সেখানে হচ্ছে ৮৭০ মিলিয়ন ঘনফুট। গড়ে কমেছে ২৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।

আরও পড়ুনঃ  হোটেলের বর্জ্যে সৌন্দর্য হারাচ্ছে কুয়াকাটা

পেট্রোবাংলা কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, দেশে এখন গ্যাসের চাহিদা দৈনিক প্রায় সাড়ে তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে সরকার এখন পর্যন্ত দৈনিক সরবরাহ করছে ৩ হাজার ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। সরবরাহ করা এই গ্যাসের মধ্যে দেশীয় উৎপাদন প্রতিদিন ২ হাজার তিনশ থেকে ২ হাজার ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বাইরে চাহিদা মেটাতে লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস বা এলএনজি আমদানি করা হয় মধ্যপ্রাচ্যের কাতার এবং ওমান থেকে। যা থেকে দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবারহ করা হয় লোকাল গ্রিডে। এছাড়া, দিনে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবারহ করা হতো স্পট মার্কেট থেকে আমদানি করা গ্যাস থেকে। দাম বুঝে বিভিন্ন সূত্র থেকে তা আমদানি করা হতো।

এদিকে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) আশা করছে বিয়ানীবাজারের গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন মিলতে পারে ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। গতকাল বৃহস্পতিবাদ সকালে এই কূপে গ্যাসের মজুদ থাকার ব্যাপারে নিশ্চিত হয় রাষ্ট্রীয় এই সংস্থাটি। সিলেটের বিয়ানীবাজার গ্যাসক্ষেত্রের পরিত্যক্ত-১ নম্বর কূপ খনন করে গ্যাসের এ মজুদ পাওয়া গিয়েছে। শিগগিরই এ কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু করা হবে বলে জানিয়েছে বাপেক্স। যেখান থেকে প্রতিদিন ১০ মিলিয়ন বা এক কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর বিয়ানীবাজারের এই কূপ খনন শুরু করে বাপেক্স।

সিলেট গ্যাস ফিল্ডস সূত্রমতে, সিলেট গ্যাস ফিল্ডসের অধীন বিয়ানীবাজার গ্যাসক্ষেত্রে দুটি কূপ রয়েছে। এর মধ্যে ১ নম্বর কূপ থেকে ১৯৯৯ সালে উৎপাদন শুরু হয়। ২০১৪ সালে তা বন্ধ হয়ে যায়। ফের ২০১৬ সালের শুরুতে উৎপাদন শুরু হয়ে আবার ওই বছরের শেষদিকে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা এই কূপে ১০ সেপ্টেম্বর থেকে আবার খননকাজ শুরু হয়।

আরও পড়ুনঃ  মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে বরাদ্দ ১৮ হাজার কোটি টাকা

খনন কাজের শুরুতে ধারণা করা হয়েছিলো এ কূপ থেকে প্রতিদিন ৭ মিলিয়ন বা ৭০ লাখ ঘনফুট গ্যাস মিলতে পারে। তবে খনন শেষে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ কূপ থেকে আরও বেশি পরিমাণ প্রতিদিন গড়ে ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গ্যাসের জন্য খ্যাতি রয়েছে সিলেটের। ১৯৫৫ সালে সিলেটের হরিপুরে প্রথম গ্যাসের সন্ধান মেলে। এরপর আবিষ্কৃত হয় আরও বেশ কিছু গ্যাসক্ষেত্র।

সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শাহিনুর ইসলাম বলেন, আরও কিছু কার্যক্রম শেষে শিগগিরেই এ কূপ থেকে উৎপাদন শুরু করতে পারবো। খনন শুরুর আগে ডিপিপিতে ধরা হয়েছিলো এখানে প্রতিদিন ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মিলতে পারে। তবে এখন মনে হচ্ছে আরও বেশিই পাওয়া যাবে।

সিলেট গ্যাস ফিল্ডসের তথ্যমতে, বিয়ানীবাজারের কূপ ছাড়াও গোলাপগঞ্জের কৈলাশটিলা-৮ ও গোয়াইনঘাট-১০ নম্বর কূপ খনন এবং রশিদপুরে ১টি পাইপলাইন স্থাপন প্রকল্পের কাজ চলছে। এসব প্রকল্পের কাজ শেষে এসজিএফএলের গ্যাস উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া দুটি প্রকল্পের আওতায় বিয়ানীবাজার ফিল্ড এবং ব্লক-১৩ ও ১৪-এর আওতায় ডুপিটিলা, বাতচিয়া, হারারগঞ্জ, জকিগঞ্জ ও সিলেট সাউথে ত্রিমাত্রিক সিসমিক জরিপ কাজ সম্পন্নের পথে।

সিলেট গ্যাস ফিল্ডসের অধীনে আরও কূপ খননের কাজ চলছে। যাতে ২০২৩ সালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। সব প্রকল্প বাস্তবায়নের পর ২০২৫ সালের মধ্যে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস থেকে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ১৬৪ মিলিয়ন ঘনফুট বৃদ্ধি পাওয়ার আশা রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  কক্সবাজারের এসপির প্রত্যাহার চান সাবেক সেনা কর্মকর্তারা

অন্যদিকে, গত ৩ নভেম্বর ভোলায় টবগী-১ অনুসন্ধান কূপে সন্ধান মেলে ২৩৯ বিসিএফ গ্যাসের। গ্রাহক পর্যায়ে বিক্রি হিসেব ধরলে যার আনুমানিক মূল্য ৮ হাজার ৫৯ কোটি টাকা। অনুসন্ধান কূপ খনন শেষে জ্বালানি বিভাগ জানায়, টবগী-১ কূপ থেকে প্রতিদিন ২ কোটি ঘনফুট হারে গ্যাস উত্তোলন করা যাবে। আগামী ৩০-৩৫ বছর এই কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন করতে পারবে পেট্রোবাংলা।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, দেশীয় জ্বালানির উৎস অনুসন্ধানে কাজ করছে সরকার। এ লক্ষ্যে ২০২২-২০২৫ সময়কালের মধ্যে পেট্রোবাংলা মোট ৪৬টি অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও ওয়ার্কওভার কূপ খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এরই অংশ হিসেবে বাপেক্সের তত্ত্বাবধানে গৃহীত প্রকল্পের আওতায় গ্যাজপ্রমের মাধ্যমে ভোলার শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্রের টবগী-১ অনুসন্ধান কূপটি গত ১৯ আগস্ট প্রায় ৩৫০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত খনন লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়। ২৯ সেপ্টেম্বর ৩৫২৪ মিটার গভীরতায় খনন কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়।

ভূতাত্ত্বিক তথ্যাদি এবং ডিএসটি রিপোর্ট অনুযায়ী টবগী-১ অনুসন্ধান কূপে গ্যাসের সম্ভাব্য মজুদ প্রায় ২৩৯ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ)। দৈনিক গড় ২০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে গ্যাস উৎপাদন বিবেচনায় ৩০-৩১ বছর উৎপাদন সম্ভব হবে। আর মজুদ বিবেচনায় গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের দাম প্রায় ৮০৫৯.০৮ কোটি টাকা। যা এলএনজি আমদানি মূল্য বিবেচনায় বহুগুণ।

আনন্দবাজার/শহক

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন