শুক্রবার, ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

আ.লীগ নেতার দখলে পাবলিক লাইব্রেরি

আ.লীগ নেতার দখলে পাবলিক লাইব্রেরি

বর্তমানে ইন্টারনেট আর আধুনিকতার যোগে বই পড়ার প্রবনতা কমে যাচ্ছে মানুষের মধ্যে। তবুও দেশের বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার বই রেখে লাইব্রেরীগুলোতে পাঠকদের মনের ক্ষুধা মেটানোর পাশাপাশি বই পড়ার প্রবনতা বাড়ানোর জন্য করা হচ্ছে নান আয়োজন। অথচ দীর্ঘ এক যুগেরও বেশী সময় যাবৎ সাভারের পাবলিক লাইব্রেরী দখল করে রেখেছে এক আওয়ামীলীগ নেতা।

সেখানে বানিয়েছেন নিজের রাজনৈতিক কার্যালয়। দলীয় কিংবা সহযোগী সংগঠনের বা সিনিয়র নেতৃবৃন্ধের জন্য সেখানে আয়োজন করা হয় নানা অনুষ্ঠানের। এক সময়ের পাঠকদের মনের ক্ষুধা মেটানো এই লাইব্রেরী এখন পরিনিত হয়ে আওয়ামীলীগ নেতার রাজনৈতিক কার্যালয় ।

জানা যায়, রাখাল চন্দ্র নামের এক ব্যক্তি  ১৯৩৯ সালে এ লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করেন । এর পরই সেখানে বসে পাঠকরাও বই পড়া শুরু করে । তবে সাবেক ঢাকা জেলা যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাসুদ চৌধুরী ওই লাইব্রেরীর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে বদলে যেতে থাকে পাবলিক লাইব্রেরীর চিত্র। সেখানে বসেই তিনি শুরু করেন তার দলীয় কার্যক্রম। নিজের প্রয়োজনে হলে চালু করা হয় লাইব্রেরীটি। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কার্যক্রম শেষে হলে বন্ধ করে দেওয়া হয় লাইব্রেরী। এমনকি এই লাইব্রেরীতে আয়োজন করা হয়ে থাকে দলীল লেখক সমিতির নির্বাচন, রাজনৈতিক বিভিন্ন সভা সেমিনারের পাশাপাশি সংবর্ধনা অনুষ্ঠান।

সাভার সরকারি কলেজের পাশেই অবস্থিত লাইব্রেরীতে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটকের উপরে লাগানো রয়েছে পাবলিক লাইব্রেরী নামে বিশাল সাইনবোর্ড। ভেতরে দেয়াল সোকেচে সারি সারি বইয়ের দেখা মিললেও পাওয়া যায়নি কোন পাঠক। তবে মাঝে মধ্যেই পাঠকের আসন গুলোতে বসে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দেখা যাচ্ছে সভা সেমিনার করতে। আবার সেখানেই বসে আয়োজন করা হচ্ছে তাদের খাবারের। লাইব্রেরীর একটু ভেতরেই থাই গ্লাস দিয়ে করা হয়েছে অফিস কক্ষ। বাহিরের সাইনবোর্ডের মতো সেখানেও অফিস কক্ষ লেখা থাকলেও তা মূলত ব্যবহার করা হয় মাসুদ চৌধুরীর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কর্যালয় হিসেবে।

আরও পড়ুনঃ  নির্বাচন কমিশন আইনের খসড়া না পড়েই মন্তব্য করছে বিএনপি-তথ্যমন্ত্রী

সাভার সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী জিসান অভিযোগ করে বলেন, তাদের কলেজের পাশেই অবস্থিত পাবলিক লাইব্রেরী। তিনি সেখানে একবার বই পড়ার উদ্দশ্যে গিয়েছিলেন। ভেতরে অনুষ্ঠান চলায় আর প্রবেশ না করেই ফিরে আসেন। এরপর আর কখনো যাওয়া হয়নি ।

নাম প্রকাশ্য অনিচ্ছুক ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা বলেন, পাবলিক লাইব্রেরী সাইনবোর্ড আর সারি সারি বইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এক সময় সেখানে অনেক শিক্ষার্থী বই পড়ার জন্য যাতায়ত করতো। তবে এখন আর সেই পরিবেশ নেই। সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিরিবিলি পরিবেশে বই পড়তে চায়। সেখানে প্রায়ই সময় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের যাতায়াত সভা সেমিনার লেগেই থাকে। সে কারণে অনেকেই লাইব্রেরীতে যেতে ভয় পায় আবার ইতস্ততবোধ করে। পাবলিক লাইব্রেরী এখন ওই আওয়ামী লীগ নেতার রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি সেখানকার পরিবেশ ফিরিয়ে নিয়ে আসার দাবি জানান।

সাভার অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রতন পিটার গমেজ বলেন, পাবলিক লাইব্রেরী সকলের জন্য উন্মুক্ত একটি স্থান। সেখানে গিয়ে সবাই বই পড়ার পাশাপাশি আলাপচারিতায় মেতে উঠবে এমনটাই হওয়ার কথা। তবে রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে তিনি কোন কথা বলতে রাজি হননি ।

সচেতন নাগরিক কমিটি সনাকের সদস্য ব্যারিষ্টার ইমাম হাসান ভুঁইয়া বলেন, পাবলিক লাইব্রেরী রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার না করে সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া উচিত। এছাড়াও শিক্ষার্থী ও তরুণ-তরুণীদের কাছে বই পড়তে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। এতে করে কিশোর বা যে কোনো বয়সি মানুষ অবসর সময়টি বই পড়ে কাটালে আমাদের সমাজে অপরাধ প্রবনতা কমে যাবে। তাই ওই লাইব্রেরীর পরিবেশ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি বই পড়ার প্রতি সকলকে উৎসাহিত করার প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

আরও পড়ুনঃ  এখনই বন্ধ হচ্ছে না বাণিজ্যমেলা : বাণিজ্য মন্ত্রণালয়

এসব বিষয়ে অভিযুক্ত ঢাকা জেলা আ. লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদ চৌধুরী বলেন, তার বিরুদ্ধে  ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। তবে মাঝে মধ্যে সভা সেমিনার করা হয় বলে স্বীকার করে তিনি বলেন, এখানে দলিল লেখক সমিতির নির্বাচন, মহিলা সংস্থার কার্যক্রম, পৌর মেয়র নির্বাচনের সময় তিনি কয়েকদিন এক ঘণ্টা করে লাইব্রেরী ব্যবহার করেছেন। জাতীয় নির্বাচনেও এটি তিন থেকে চার দিন ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে সাভারের সব ধরনের নেতাকর্মীরাই আসেন। তবে এতো সব আয়োজনের কারণে সেটি কি কোন রাজনৈতিক কর্যালয়ে পরিণত হয়নি বা পাঠকদের বই পড়াত কোনো বিঘ্ন ঘটে না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমার কাছে এরকম মনে হয় না ।

এ ব্যাপারে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পাবলিক লাইব্রেরীর সভাপতি মাজহারুল ইসলাম বলেন, পাবলিক লাইব্রেরী অনেক পুরানো একটি ভবন। বিভিন্ন সময় মেরামত করে ভবনটি ব্যবহারের উপযোগী করা হয়েছে। সেখানে কোনো রাজনৈতিক কার্যালয়ের বিষয়টি তার জানা নেই। এ রকম কিছু হয়ে থাকলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন