মঙ্গলবার, ২১শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

গোখাদ্য সংকটে কচুরিপানা

গোখাদ্য সংকটে কচুরিপানা

বেশি দামে গো-খাদ্য কিনে লোকসান গোনায় খামারের অর্ধেক পশু বিক্রি করে দিয়েছি: আব্দুর রহিম, খামারি, উত্তর নারিবাড়ি, কলেজ লোড, গুরুদাসপুর

কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কাঁচা ঘাসের হাট বসানোয় খামারিরা উপকৃত হচ্ছে: গোলাম মোস্তফা, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, নাটোর

চলনবিল অঞ্চলে বন্যা, অতি বৃষ্টি, খরা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি আর বৈরি আবহাওয়ার কারনে গো-চারণ ভূমি ও ঘাসের ক্ষেত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে এ অঞ্চলে দেখা দিয়েছে গো-খাদ্যের তীব্র সংকট। ফলে গরু, মহিষ, ছাগল-ভেড়া নিয়ে বিপাকে পড়েছেন খামারি ও পশু পালনকারিরা। এছাড়া ভাটি এলাকায় গো-খাদ্যের সংকট বেশি হওয়ায় এ এলাকার গো-খামারিরা চলনবিল এলাকা থেকে বেশি দামে খড় ক্রয় করে নৌকা ও সড়ক পথে নিয়ে যাচ্ছেন ভাটির দিকে। ফলে বাতির নিচেই যেন অন্ধকার নেমে আসছে।

এদিকে, মাঠ থেকে কাঁচা ঘাস সংগ্রহ করতে না পেরে চলনবিল এলাকার গরু-মহিষের মালিকদের খড়ের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। খড়ের দাম বেশি হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন অনেকে। গো-খাদ্যের চাহিদা মেটাতে গরু-মহিষকে খাওয়ানো হচ্ছে কচুরিপানাসহ কলার গাছ।

চলনবিলের পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, নাটোরের গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম, সিংড়া, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া, তাড়াশ উপজেলার বেশ কিছু এলাকা এখনও বর্ষার পানিতে ডুবে আছে। মাঠের পর মাঠ এখনও পানির নিচে। এতে জমিতে কেউ ঘাস বপন করতে পারছেন না। এতে করে এ অঞ্চলে গো-খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন এলাকার খামারি ও পশু পালনকারিরা।

এদিকে গো-খাদ্যের সংকটের কারণে স্থানীয় খড় ব্যবসায়ীরা বোরো ধানের খড় রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহসহ দেশের উঁচু এলাকার জেলাগুলো থেকে ক্রয় করে সড়ক ও নৌ-পথে নিয়ে আসছেন। এতে চলনবিল অঞ্চলে খড়ের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলছে। বর্তমানে এ অঞ্চলে প্রতি ১শ’ আঁটি ধানের খড় সাড়ে ৬শ’ থেকে ৭শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে গো-খাদ্যের বিকল্প হিসেবে কচুরিপানা, কলার গাছসহ বিভিন্ন গাছের লতা-পাতা অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে গবাদি পশু। পাশাপাশি গাভি গরুর দুধ উৎপাদনের পরিমাণও কমে যাচ্ছে। ফলে প্রতিনিয়ত গাভি মালিকদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।

আরও পড়ুনঃ  রাশিয়ার কব্জায় পারমাণবিক কেন্দ্র

নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার যোগেন্দ্রনগর গ্রামের শরিফুল ইসলাম জানান, আমার তিনটি গরুর ফার্ম রয়েছে। প্রতি মণ খড় দ্বিগুণ দামে ক্রয় করতে হচ্ছে। খইল ভূষির দামও অনেক বেড়েছে। বাধ্য হয়ে বিল ও নদী থেকে কচুরিপানা সংগ্রহ করে খাওয়াতে হচ্ছে। এতে গবাদি পশু মাঝে মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। গরুর দুধ উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় গবাদি পশুপালন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে জানান তারা।

গুরুদাসপুর থানা সদরে বঙ্গবন্ধু কলেজ রোডের উত্তর নারিবাড়ি খামারি আব্দুর রহিম খান জানান, আমার খামারে অনেকগুলো গরু ও ছাগল ছিলো। কিন্তু গো-খাদের দাম বাড়ার কারণে লোকসান গুণতে হচ্ছে। যার কারণে প্রায় সবগুলোই বিক্রি করে দিয়েছি। বর্তমানে আমার খামারে ১০টি বিদেশি ছাগল আর মাত্র ৫টি গরু রেখেছি।

গুরুদাসপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর হোসেন জানান, অনেক খামারি খাদ্য সংকটের কারণে কচুরিপানা খাওয়াচ্ছেন বলে শুনেছি। প্রতিবছর বন্যার কারণে চলনবিল এলাকায় গো-খাদ্য সংকট দেখা দেয়। তবে গবাদি পশুকে কচুরিপানা বা অন্যান্য গাছপালার পাতা না খাওয়ানোই ভালো। এতে নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

ডা. মো. আলমগীর হোসেন বলেন, গোচারণ ভূমি বন্যা কবলিত হওয়ায় খামারিদের ঘাসের অভাব দেখা দিয়েছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। সরকারি কোনো সহযোগিতা পেলে খামারিদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। গুরুদাসপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে শুধু মাত্র গুরুদাসপুরেই গরুর খামার রয়েছে ৭২টি। মোট গরুর সংখ্যা ১ লাখ ৫ হাজার। মোট ছাগলের বাণিজিক খামার রয়েছে ৪৯টি, ছাগলের সংখ্যা ১ লাখ ৩৫ হাজার। মহিষের সংখ্যা ৪শ ২০টি। ভেড়ার ১১টি খামারে মোট ৪২০টি ভেড়া রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  পাঁচবিবিতে নর্থ বেঙ্গল কিন্ডার গার্টেনের মতবিনিময় সভা

এবিষয়ে গুরুদাসপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাকিল আহমেদ জানান, চলনবিলে কি গো-চারণ ভুমি ছিলো? এ বিষয়ে আপনিও স্টাডি করেন তারপরে  আমার কাছে পাঠান আমি দেখে তারপর বক্তব্য দিবো।

নাটোর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা গোলাম মোস্তাফা জানান, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ, নতুন ঘরবাড়ি নির্মাণ, বৈরী আবহাওয়া আর নগরায়নের ফলে গো-চারণ ভূমি কমে আসছে। তবে খামারিরা ব্যক্তি পর্যায়ে উন্নতমানের ঘাস চাষ করে তাদের চাহিদা পূরণের চেষ্টা করছেন।

তাছাড়াও নাটোর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা জেলার বিভিন্ন হাটে কাঁচা ঘাসের হাট বসে সেখান থেকে খামানিরা ঘাস ক্রয় করে থাকে। যেটি আমরা কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এই ব্যবস্থা করেছি। এতে কৃষক এবং খামারিরা উভয়ই উপকৃত হচ্ছে। এছাড়াও গবাদি পশুর জন্য ৯০ শতাংশ শুকনো এবং ১০ শতাংশ কাঁচা ঘাসের প্রয়োজন হয়।

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন