রবিবার, ২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১২ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
শিক্ষায় বিশেষ বরাদ্দের দাবি--

করোনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাখাত

করোনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাখাত
  • করোনায় বাল্যবিয়ে ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি যা ২৫ বছরে সর্বোচ্চ

করোনা মহামারির কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ‘শিক্ষা’। করোনা পরিস্থিতির কারণে গত ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হলে দীর্ঘ ১৮ মাস পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পর অনেক শ্রেণিকক্ষে ফিরে আসে নি সব শিক্ষার্থী। ব্রাকের গবেষণার তথ্যমতে, দেশে করোনার কারণে বাল্যবিবাহ ১৩ শতাংশ বেড়েছে। যা গত ২৫ বছরে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ।

গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অন্তর্ভুক্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার অন বাজেট এন্ড পলিসির উদ্যোগে ‘বাজেট ২০২২-২৩: শিক্ষা ও কর্মসংস্থান’ শীর্ষক একটি আলোচনা সভায় উপস্থাপন করা মূল প্রবন্ধে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সেখানে শিক্ষাখাতকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাত হিসেবে উল্লেখ হয়।

প্রবন্ধে মহামারির সময় অনলাইন ক্লাসের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, যতটুকু অনলাইন ক্লাসের সুযোগ ছিল, সেই সুযোগ ও সব শিক্ষার্থী সমানভাবে নিতে পারেনি। গণসাক্ষরতা অভিযানের এডুকেশন ওয়াচ প্রতিবেদনের তথ্যমতে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ৬৯.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারেনি। আশংকা করা হচ্ছে এর কারণে ডিজিটাল অসমতা তৈরি হয়েছে।

এগুলো ছাড়াও করোনা পরিস্থিতির কারণে শিক্ষাখাতে আরও বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে উল্লেখ করে এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য নানা ধরনের সুপারিশ করা হয়। সুপারিশে বলা হয়, সামগ্রিক শিক্ষাখাতের ওপর করোনার প্রভাব নিয়ে তথ্য উপাত্তের অভাব রয়েছে। প্রত্যাশা ছিল যে আগামী অর্থবছরে শিক্ষাখাতের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বিশেষ কর্মসূচি থাকবে। তার প্রতিফলন বাজেটে অনুপস্থিত। তাই গতানুগতিক বাজেট বরাদ্দ এবং কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষাখাতের ওপর বিশেষ বরাদ্দ এবং সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

আরও পড়ুনঃ  রাতভর বিদ্যুৎ অপচয়

সরকার ২০২০-২১ অর্থবছরে বৃত্তি এবং কিট এলাউয়েন্স বাবদ ৩ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা জিটুপি সিস্টেমের মাধ্যমে ১ কোটি ৪০ লক্ষ শিক্ষার্থীর মায়ের একাউন্টে পৌঁছে দিয়েছে। অর্থাৎ একটি ভালো ডাটাবেইজ আছে। এই ডেটাবেইজকে কাজে লাগিয়ে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করার -একটি উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হয়।

ঢাবির সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলায়াতনে আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম। এরপর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার অন বাজেট পলিসির পরিচালক অধ্যাপক ড. এম আবু ইউসুফ।

প্রবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়, আগামী অর্থবছরে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ৮১ হাজার  ৪৪৯ কোটি টাকা। বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় যা প্রায় অপরিবর্তিত ১২ শতাংশ। কিন্তু জিডিপির তুলনায় প্রস্তাবিত বরাদ্দ কমেছে ১.৮৩ শতাংশ। বিদায়ী অর্থবছরে জিডিপির তুলনায় সংশোধিত ব্যয় ছিল ২.০৮ শতাংশ। ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় শিক্ষাখাতের বরাদ্দ ২০২৫ সালের মধ্যে জিডিপির ৩.৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আরো তৎপর হওয়া প্রয়োজন।

শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বিষয়ে প্রবন্ধে আরও বলা হয়, বাজেটে আমদানিকৃত ল্যাপটপ অথবা কম্পিউটারের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। কোভিড পরবর্তী সময়ে সশরীর ও অনলাইনে একটি মিশ্র শিক্ষা ব্যবস্থা দৃশ্যমান। এই মিশ্র শিক্ষা ব্যবস্থায় ডিজিটাল ডিভাইসের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য ডিজিটাল ডিভাইসের উপর প্রস্তাবিত কর প্রত্যাহারের কথা বলা হয়। পাশাপাশি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহে চলতি শিক্ষাবর্ষের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অনলাইনভিত্তিক কার্যকর দুরশিক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য বাজেট বরাদ্দ ও কর্মসূচী রাখার আহ্বান জানানো হয়।

আরও পড়ুনঃ  গোপালপুরে শিক্ষক-কর্মচারীদের মাঝে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক প্রণোদনা প্রদান

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। এছাড়াও সম্মানিত অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ- উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী, বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান।

সেন্টার অন বাজেট এন্ড পলিসির সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শবনম আযীমের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় মূল আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মাহবুবুল মোকাদ্দেম আকাশ এবং উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাত হচ্ছে শিক্ষাখাত। এর কারণ হচ্ছে শিক্ষাখাত থেকে প্রাপ্ত ফলাফল শ্রমবাজারে নিয়ে যেতে না পারা এবং শিক্ষা-কার্যক্রম পূর্নাঙ্গভাবে পরিচালনা করতে না পারা। এক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষা কার্যক্রমে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর উভয়ের অভাব রয়েছে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মাহবুবুল মোকাদ্দেম আকাশ বলেন, বাজেট প্রণয়নের আগে দুটি জিনিস ভালোভাবে লক্ষ্য করা দরকার। বছরে আমরা কত টাকা আয় করতে পারবো এবং কোন খাতে কতটুকু যথাযথ ব্যয় করতে পারবো, এই দুটি বিষয়ের ওপর লক্ষ্য রেখে বাজেট প্রণয়ন খুবই জরুরি। কিন্তু আমাদের যা আয় করা দরকার তার থেকে কম আয় করছি।

আরও পড়ুনঃ  বশেমুরবিপ্রবির বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদযাপন

আর আমাদের ব্যয়ে অসংখ্য ছিদ্র আছে। একটা খাতে বাজেটের অর্থ যেখানে যাওয়া দরকার সেখানে না গিয়ে মাঝপথে গিয়ে বেঁকে যায়। এখানে একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, শিক্ষা ও প্রযুক্তি দুটি আলাদা খাত। কিন্তু বাজেট এই দুটি খাতকে একই করা হয়। যার ফলে যথার্থ কাজ হয় না। এ কারণে তিনি শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত থেকে সতন্ত্র শিক্ষা বাজেট দাবি করেন।

তবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল অধ্যাপক ড. মাহবুবুল মোকাদ্দেম আকাশের দাবির প্রতি দ্বিমত পোষণ করে বলেন, শিক্ষাখাতে যে বরাদ্দ (৮১,৪৪৯ কোটি টাকা) দেওয়া হয়েছে তা শুধুই শিক্ষাখাতে খরচ হবে। এর কোনো টাকাও অন্যখাতে খরচ হবে না। মন্ত্রী আরও বলেন, শিক্ষাবাজেটে যে লিকেজগুলো হচ্ছে এগুলোর দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এসময় তিনি শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে বলে মত দেন এবং সেইসাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাডেমিক মাস্টার প্লানের সাথে অবকাঠামো উন্নয়নের দিকে মনোযোগি হতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে আহ্বান জানান।

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন