শুক্রবার, ২১শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

দরকষাকষিতে চিড়েচ্যাপ্টা

দরকষাকষিতে চিড়েচ্যাপ্টা

বেলা তখন ১১টা। রাজধানী ঢাকার ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের চালের দোকান স্বাধীন রাইস এজেন্সি। সেখানে দীর্ঘক্ষণ ধরে চাল হাতে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন এক ভদ্রমহিলা। দামাদামিও করছেন। প্রতিবেদক রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় বিষয়টি লক্ষ্য করে দাঁড়িয়ে যান। এই চালের দাম কত, ওইটার দাম কত? এভাবে অনেক সময় ব্যয় করেন ভদ্রমহিলা। অনেক দামাদামির পর ২৫ কেজি চাল কেনেন।

এবার ভদ্রমহিলার কাছে প্রতিবেদকের প্রশ্ন ছিল, আপনি দীর্ঘক্ষণ ধরেই দামাদামি করলেন? এমনটা আগে কি হয়েছে? সেই নারী স্মিত হেসে বললেন, কী করবো বলুন, বাজারে এলে মাথা ঠিক থাকে না। সবকিছুর দাম তো চড়া। এক সপ্তাহ আগে যে চাল কিনেছি ৬০ টাকায় তা এখন ৬৫ টাকা।

পেশা সম্পর্কে জানতে চাইলে ভদ্রমহিলা জানালেন তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মরত একজন চিকিৎসক। নাম নুসরাত জাহান। পাল্টা প্রশ্ন করা হয়, চিকিৎসকদের তো টাকার অভাব নেই- অথচ আপনি? জবাবে ডা. নুসরাত বললেন, দেখুন সবকিছুর দাম বেড়েছে। আগে রিকশায় হাসপাতালে যেতাম ২০ টাকা করে, এখন ৪০-৫০ টাকা দিতে হয়। উল্টো প্রশ্ন করেন, চাল-ডাল-তেল কোন পণ্যটির দাম বাড়েনি বলুন? দেখুন, আমাদের বেতন বাড়েনি তবে বেড়েছে ব্যয়। হিমশিম খাচ্ছি বাজার নিয়ে।

ঠিক সেই সময়ে আরো দুইজন ক্রেতা দোকানে আসেন। তবে বিভিন্ন জিনিসের দামাদামি করে চলে গেলেন। দোকানটির স্বত্বাধিকারী নীরব বললেন, মানুষ এখন চরকির মতো ঘোরে। কোনো স্থিরতা নেই। কোনো কিছু কেনার ক্ষেত্রেও অস্থির। এখন আমার এখানে দামাদামি করে অন্য দোকানে চলে যান। এই মাসেই আমাদের বেচাবিক্রি ২০ ভাগ কমে গেছে।

একসময় কৃষিশ্রমিক ছিলেন আবুল হোসেন (৮০)। টাঙ্গাইলে বাড়ি। রাজধানীতে এসে অন্যের কাছে হাত পাতেন। হাতের বাটিতে কিছু চাল, কাঁধে একটা ব্যাগ। কাপড়-চোপড় পরিচ্ছন্ন। আবুল হোসেন বললেন, তার স্ত্রী অন্যের বাড়িতে কাজ করে। আর তিনি নিজে ভিক্ষা করেন। খুব কম আয়ে কোনোভাবে কেটে যায় দিন। তার ভাগ্যে জোটেনি বয়স্ক ভাতা। হতাশ হয়ে বলেন, সবাই তেলি মাথায় তেল দেয়। আমাদের তো ভাগ্যের চাকা ঘোরে না।

আরও পড়ুনঃ  সমৃদ্ধ শব্দ ভাণ্ডারই সাবলীল প্রতিবেদনের অনুষঙ্গ

নীলক্ষেত থেকে কারওয়ান বাজারে এসেছেন এক প্রবীণ। দু’হাতে দুটি ব্যাগ নিয়ে ক্লান্তভাবে হেঁটে চলছেন। জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমিতে (নায়েম) অফিস সহকারী পদে চাকরি করছেন দীর্ঘদিন ধরে। ছয়জনের সংসারে বড় ছেলেসহ দুজন মাত্র আয় করেন। তারপরেও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তার চাকরির বয়সও আর বেশি নেই। পলাশী ও হাতিরপুর বাজার থাকতে কারওয়ান বাজারে কেন কেনাকাটা করতে এসেছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংসারের দুটো পয়সা বাঁচাতেই এতদূর আসা। দুই বাজারে জিনিসপত্রের দাম কেজিতে ২০-৩০ টাকা পার্থক্য।

হাতিরপুল কাঁচাবাজারে সাত বছর ধরে ব্যবসা করছেন মিলন। গত ২০ দিনে সবজির বাজারে দাম বেড়েছে কেমন? এমন প্রশ্ন করলে বলেন, প্রতিটি জিনিসের দামই ৫-১০ টাকা করে বেড়েছে। হাতিরপুরে বাজার করতে আসা জাহিদ রাকিব জানালেন, সংসারের খরচ বাঁচাতে এখন ফল খাওয়ায় বিরতি দিয়েছেন। বলেন, খরচ মাসে কমপক্ষে পাঁচশ টাকা বেড়েছে। আগে মেসে ২ হাজার টাকা খরচ হতো। এখন সেখানে আড়াই হাজার টাকাতেও হয় না। এখন মধুমাস হলেও দাম আরো কমে আসার অপেক্ষায় মৌসুমী ফল কেনায় রণে ভঙ্গ দিয়েছেন।

সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর থানার মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক রঞ্জিত কুমার বর্মন। তার সঙ্গে কথা হয় মোবাইল ফোনে। বাজারের সঙ্গে সংসারের ব্যয়ের হিসাব মেলানো বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, সংসারের ঘানি টানতে গিয়ে তিনি ক্লান্ত। ২০১৫ সালের পর বেতন আর বাড়েনি। অথচ বাজারের উচ্চমূল্য তার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। নিজের তেমন জমি নেই যে চাষ করবো। বেতনের ওপর নির্ভরশীল। তবে বাজারের ঊর্ধ্বগতি আমাকে ক্লান্ত করে ফেলছে। রঞ্জিত কুমার বলেন, সপ্তাহ খানেক আগে যে পেঁয়াজ ৩২ টাকায় কিনেছি, তা এখন ৩৮ টাকা। মশুর ডাল এখন কিনতে হচ্ছে ১৪০ টাকা কেজি। অথচ কয়েকদিন আগেও ১১০ টাকায় কিনেছি।

আরও পড়ুনঃ  করোনা উপসর্গ নিয়ে সাবেক কৃষি কর্মকর্তার মৃত্যু

রাজধানীর সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজরে কথা হয় ডিম বিক্রেতা কিরণের সঙ্গে। বলেন, ডিমের প্রতি মানুষের চাহিদা বেড়েছে। অন্যান্য পণ্যের দাম অনেক বেশি। ব্যাচেলররা কোনোমতে একটা ডিম ভেজে খেয়ে শুয়ে থাকেন। ২০ দিনের ব্যবধানে ৫-১০ টাকা বেড়েছে ডজনে। একই বাজারের মিলন মাছ বিক্রি করেন। বলেন, রুই মাছ ৩২০ টাকা, তেলাপিয়া ১৫০ টাকায় বিক্রি করছেন। কেজিতে দাম বেড়েছে ২০-৩০টাকা। দাম বৃদ্ধির কারণে ক্রেতাও কমেছে।

দেশের নিত্য প্রয়োজনীপণ্যের বাজারের যে চিত্র সরকারের ঘোষিত তথ্য তার ঠিক উল্টো। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মূল্যস্ফীতির হিসাবে গত তিন মাস ধরে টানা মূল্যস্ফীতি হয়েছে, যা ৬ শতাংশের ওপরে আছে। এপ্রিলে ছিল ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। এই এপ্রিলেই নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভুগেছে মানুষ। অথচ সরকারি হিসাব বলছে, এ মাসে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি কমেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিবিএস মূল্যস্ফীতির হিসাব জাতীয় পর্যায়ের গড় হিসাব। মূল্যস্ফীতির প্রভাব সবার জন্য ৬ শতাংশ নয়। গরিব মানুষের ওপর এর প্রভাব অনেক বেশি। শহরের মূল্যস্ফীতি হিসাব করতে ৪২২টি পণ্য বিবেচনা করে বিবিএস। গত মার্চ এসব পণ্যের মধ্যে ২২৪টি পণ্যের দাম ৬ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে গত এক মাসে (১৯ এপ্রিল থেকে ১৯ মে) নিত্যপণ্যের এই মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় আছে আটা, ময়দা, ভোজ্যতেল, ডাল, ডিম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, শুকনা মরিচ, চিনি ও লবণ। তাদের হিসেবে, গত এক মাসে বিভিন্ন পণ্যে ১ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। ১০০ শতাংশ দাম বেড়েছে দেশি নতুন-পুরোনো রসুনের। আটা ও ময়দার দাম কেজিতে বেড়েছে যথাক্রমে ৩০ ও ১৯ শতাংশ পর্যন্ত। মানভেদে ডালের দাম খুচরা বাজারে কেজিতে বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা। ডিমের দাম হালিতে বেড়েছে ৫ থেকে ৭ টাকা। অন্যদিকে গত এক মাসের ব্যবধানে আলুর দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ টাকায়। আদা, লবণ ও চিনির দামও কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে।

আরও পড়ুনঃ  ধামইরহাটে বিট পুলিশিং অফিস উদ্বোধন

আন্তর্জাতিক বাজারে গত এক বছরের ব্যবধানে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এক বছর আগে এক ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বিক্রি হয়েছে ৬০ ডলারে। চলতি সপ্তাহে তা দাঁড়িয়েছে ১০৫ থেকে ১১০ ডলারে। এক বছর আগে ১২০০-১৩৩০ ডলারে এক টন সয়াবিন তেল আমদানি করা হলেও এখন তা ১৮৬০ ডলার।

অন্যদিকে, বিদ্যুতের দাম প্রায় ৫৮ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের অজুহাতে যাবতীয় নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে বিশ্বে। আবার আকাশে সূর্যের উত্তাপ বাড়ছে। দেশের পূর্বাঞ্চলে সিলেট অঞ্চলে অকাল বন্যায় নষ্ট হচ্ছে বোরো ধান। বাজারে চরম অস্থিরতা বিরাজমান। অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতিতে সংসারের কোনো হিসেবে মিলছে না

আনন্দবাজার/শহক

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন