শুক্রবার, ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

বসন্তের স্বপ্নে পোশাকখাত

বসন্তের স্বপ্নে পোশাকখাত

কয়েক মাসের খরা কাটিয়ে চলতি শীত মৌসুমে শিল্পখাতে গ্যাস আর বিদ্যুৎ সরবরাহে উন্নতি ঘটেছে। কলকারখনায় পুরোদমে উৎপাদন কার্যক্রম চলছে। যে কারণে আগামী বসন্ত বা গ্রীষ্মকালের অর্ডার পেতে আর কোনো ভাবনা থাকছে না। এমনটাই আশা করছেন পোশাকখাতের ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, শিল্পাঞ্চলে গ্যাস ও বিদ্যুত সরবরাহ পরিস্থিতির ভালো উন্নতি হয়েছে। এতে আগামী গ্রীষ্ম নাগাদ, গত কয়েক মাসের ধীরগতির প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসার আশা করা হচ্ছে।

তৈরি পোশাকখাতের ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এরমধ্যেই শীর্ষ বিদেশি বায়াররা অর্ডার দেওয়ার জন্য খোঁজখবর নিতে শুরু করেছে। আর পোশাক প্রস্তুতকারকরাও জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির ফলে নতুন অর্ডার পূরণের মাধ্যমে গত কয়েক মাসের মন্থর দশার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারা যাবে বলে মনে করছেন। কয়েকজন ব্যবসায়ীর ভাষ্যমতে, বর্তমান ধারায় বেচাকেনা চললে আর কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ পেলে আসছে বছরের এপ্রিল নাগাদ পোশাক খাত আবার সন্তোষজনক অবস্থানে ফিরবে।

জ্বালানি তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও সরবরাহের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, সরবরাহ লাইনের প্রান্তিকে থাকা কিছু শিল্প গ্রাহক গ্যাসের চাপ তেমন পাচ্ছেন না। তবে এই সমস্যাও ধীরে ধীরে কেটে যাবে। তবে বর্তমানে গোটা শিল্পাঞ্চলে কোনো সমস্যা নেই। বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফ) গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। গত বছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৬০০ এমএমসিএফ।

সূত্রমতে, আসছে বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরবরাহ পরিস্থিতির আরও উন্নতি হতে থাকবে। শীত শেষে মার্চ থেকে গ্যাস চাহিদা আবার বাড়তে থাকবে। এরমধ্যেই অতিরিক্ত এলএনজি (তরলীককৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানির কথা ভাবছে সরকার। পোশাক রপ্তানিকারকরা বলেছেন, চলতি বছরের জুলাই বা আগস্টের চেয়ে কারখানা পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির বেশ উন্নতি হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী

সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্যমতে, গাজীপুরের মাওনা এবং ময়মনসিংহের ভালুকা শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের কিছু এলাকাতেও এখন আগের চেয়ে সরবরাহ ভালো অবস্থায় আছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, মানিকগঞ্জ, সাভার, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার এবং গাজীপুরের তৈরি পোশাক শিল্প হাবের কিছু এলাকায় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এসব এলাকায় শিগগিরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশ্বস্ত করছেন পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা।

তারা বলছেন, বিদ্যুৎ রেশনিং এবং অফিসের সময়সূচি পুনঃনির্ধারণসহ সরকারের কিছু সাশ্রয়ী উদ্যোগের ফলে শিল্পে গ্যাস সংকটের সমস্যা অনেকটাই সমাধান হয়েছে। এসব উদ্যোগের পাশাপাশি শীতকালে বিদ্যুতের চাহিদা কমার ঘটনায়, চাপ কমেছে গ্যাস ব্যবহারের ওপর। আর সেকারণে শিল্পাঞ্চলের গ্রাহকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জোগান দিতে পারছে পেট্রোবাংলা।

মূলত, তৈরি পোশাক উৎপাদনের প্রধান উপাদান তুলা আমদানির ওপর বাংলাদেশের পোশাক খাতের ব্যাপক নির্ভরশীলতা রয়েছে। তুলা থেকে সুতা তৈরি, কাপড় প্রস্তুত ও ডায়িংয়ে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন চালিয়ে যেতে কারখানায় স্থাপিত ছোট আকারের নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করেন পোশাক প্রস্তুতকারকেরা।

শিল্প মালিকরা বলছেন, পোশাক কারখানাগুলো ঘন ঘন লোডশেডিং, গ্যাসের চাপ কম থাকা এবং দ্রুত হ্রাসমান বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ রক্ষায় সরকারের আমদানি কমানোর উদ্যোগের ফলে কাঁচামাল ঘাটতির শিকার হয়। অথচ পোশাক ও বস্ত্রবয়ন (টেক্সটাইল) বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিল্প। মহামারি শেষে উন্নত বিশ্বের ভোক্তাদের চাহিদা বৃদ্ধির সুফল লাভ করে এ দুই শিল্প। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাতে, গত জুলাই থেকে চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাকপণ্য রপ্তানিকারক বাংলাদেশে আসা অর্ডারের গতি কমে আসে। উদ্যোক্তারা জানান, মস্কোর ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাসহ বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

আরও পড়ুনঃ  সরকারকে চাল না দেয়ার ঘোষণা

সবমিলিয়ে দেশের ও বিশ্ব পরিস্থিতি শঙ্কার কালো ছায়া ফেলেছিল পোশাক শিল্পে। রপ্তানি তথ্যানুসারে, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে প্রথমবারের মতো নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির শিকার হয় পোশাক রপ্তানি। তবে অক্টোবরে এটি ইতিবাচক ধারায় ফেরে এবং নভেম্বরে বড় উল্লম্ফন হয়।

স্থানীয় প্রস্তুতকারকেরা বলছেন, আগামী বছর বিশ্বমন্দা দেখা দিলেও একেবারে সাধারণ পোশাক পণ্যের চাহিদা খুব একটা কমবে না। এছাড়া, ওয়াশিংটন-বেইজিং এর সম্পর্কে অবনতি এবং কোভিড বিধিনিষেধের জের ধরে চীন থেকে অনেক অর্ডার বাংলাদেশে চলে আসবে বলে মনে করছেন তারা।

আনন্দবাজার/শহক

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন