শুক্রবার, ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

দখল-দূষণে দমবন্ধ

দখল-দূষণে দমবন্ধ

গাজীপুরে একটি জলাশয়ও দূষণমুক্ত নেই। পরিবেশ দূষণে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে গাজীপুর জেলা। জলাশয়গুলো সংকুচিত হওয়া, দখল হওয়া, কারখানা ও গৃহস্থালী বর্জ্য ফেলা, বনের জমিতে কল কারখানা, বসতবাড়ি, পার্ক নির্মাণ, শালসহ প্রাকৃতিক বনজ গাছ কেটে ভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণসহ নানা কারণে দূষণে এসব ঘটনা ঘটছে বলে মন্তব্য করেছেন শুনানিতে অংশ নেওয়া বিভিন্ন কমিউনিটির মানুষ।

গতকাল সোমবার বেলা ১২টায় গাজীপুরের পিটিআই ক্যাম্পাসের শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার অডিটোরিয়ামে পরিবেশবাদী সংগঠন বেলা, নদী পরিব্রাজক দল, সিএএফওডি, সুইডেন সেভরিজ’র আয়োজনে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। “পরিবেশ দূষণে বিপর্যস্ত গাজীপুর” শিরোনামে শুনানিতে বেলা’র প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের পরিচালনায় প্রধান অতিথি ছিলেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আনিসুর রহমান। বক্তব্য রাখেন গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট রীণা পারভীন, ভাষা শহীদ কলেজের অধ্যক্ষ মুকুল কুমার মল্লিক, বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ মনির হোসেন প্রমূখ।

ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের অধ্যাপক অসীম বিভাকর বলেন, গাজীপুরের পরিবেশ স্বাভাবকি করতে হলে জনগণের অংশগ্রহণে প্রশাসনের নিয়মিত মনিটরিং, আইনের যথাযথ প্রয়োগ ঘটাতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ কৃষি জমিতে কারখানা ও বাড়ি-ঘর নির্মাণ করা যাবে না। শিল্পায়ন যেমন ভাবে অর্থনীতির জন্য বড় ভূমিকা রাখে তেমনি পরিবেশ দূষণ বন্ধ করা অর্থনীতির জন্য অন্যতম সহায়ক।

গাজীপুর ইতিহাস ঐতিহ্য উন্নয়নের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী শামসুল হক বলেন, জলাশয়েরর আইনের কারণে বিজিএমইএর ৫শ কোটি টাকার ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। কাগজেপত্রে গাজীপুরের জনসংখ্যা দেখানো হয় ২৬ লাখ। কিন্তু বাস্তবে রয়েছে ৭০ লাখ। ২৬ লাখ জনগোষ্ঠীর বর্জ্যের জন্য প্রতিদিন ৭০ শতক জায়গার প্রয়োজন। অথচ এখনো পর্যন্ত অপরিকিল্পতভাবে সড়ক ও জনপথের জায়গায় দিনের পর দিন বর্জ্য ফেলে যাচ্ছে সিটি করপোরেশন।

আরও পড়ুনঃ  চীন-ভিয়েতনামের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হলো চট্টগ্রাম বন্দর

গাজীপুরে শব্দ দূষণের অনুষ্ঠান হয় শিক্ষার্থীদের নিয়ে। তাদের কান বন্ধ রাখা ছাড়া আর কী পরামর্শ দেয়া যাবে? অথচ যারা শব্দ দূষণ করে যেমন পরিবহন চালক এবং শব্দ দূষণ করে এমন প্রতিষ্ঠানের লোকদের ডেকে নিয়ে অনুষ্ঠান করা দরকার।

নদী পরিব্রাজক দলের গাজীপুরের সভাপতি মোশারফ হোসেন বলেন, মোগরখালের পাড়ে মাদ্রাসা, মসজিদসহ স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। মোগরখালটি ৯টি গ্রামের বুক চিরে প্রবাহিত। খালের দুই পাশে ২০টি গ্রামের উপকারভোগী মানুষ রয়েছেন। হাজার হাজার একর জমি আবাদ হয় খালের পানি দিয়ে। যদিও আমরা এখন আর কৃষি জমি আবাদ করতে পারছি না। অতি সম্প্রতি খালের ওপর একটি ব্রিজ নির্মাণ করে খালের প্রবাহ উল্টোদিকে ঘোরানো হয়েছে। ব্রিজটি খালের পানি প্রবাহের দিকে করার অনুরোধ করছি।

শ্রীপুর উপজেলা নদী পরিব্রাজক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. খোরশেদ আলম বলেন, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পরিবেশ দূষণরোধে পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজন কখনো ভূমিকা রাখতে যায়নি। শ্রীপুর পৌর এলাকার আসওয়াদ গার্মেন্টসসহ একাধিক কারখানা দিনের পর দিন রাসায়নিক বর্জ্যে পরিবেশ দূষণ করছে। নাম্বারবিহীন ড্রাম ট্রাক দিয়ে কল কারখানার বর্জ্য দিনে অথবা রাতের আঁধারে শ্রীপুরের লবনদহ খালের গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ী ব্রিজ থেকে ফেলা হয়। মুলাইদ এলাকার আকিজ ক্যামক্যিাল কারখানার বর্জ্য নিয়মিত ওই খালে ফেলা হচ্ছে।

মো. খোরশেদ আলম বলেন, শুধু একটি নয়, টঙ্গী থেকৈ ময়মনসিংহের বালুকা পর্যন্ত যতগুলো ক্যামিক্যাল কারখানা রয়েছে সবগুলোর বর্জ্য শ্রীপুরের গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ী লবনদহ ব্রিজ থেকে ফেলা হচ্ছে। এটি প্রতিরোধের জন্য মহাসড়ক দিয়ে আসা সেসব ট্রাকগুলো চিহ্নিত করে আটকিয়ে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন, ৮৩টি রেইনট্রি কড়ই গাছ রোপনের পর ৫৩টি গাছ বেঁচেছিল। পরে বিষাক্ত দূষণে সবগুলো মৃত গাছ এখন দাঁড়িয়ে রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  সেচ খাল সংস্কারে ‘ঘাপলা’

রোভারপল্লী ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক আমীর হোসেন বলেন, বন বিভাগের স্থানীয় লোকজনই মনিপুরের বন ধ্বংস করছে। তারা ১৫/২০ ফুট বনের জমি ৫০ থেকে এক লাখ টাকার বিনমিয়ে বাড়ি করার অনুমতি দিচ্ছে। শিল্পমালিক যারা বন দখল করছে, রিসোর্ট পার্ক তৈরি করছে সেসব রাঘব বোয়ালদের বিরুদ্ধে বন মামলা হয় না। তাদের সংখ্যা খুব কম। মামলার শিকার হচ্ছে এলাকার নিরীহ সাধারণ মানুষ, যারা দখলের প্রতিবাদ করে। এাকার লোকজন দখলের প্রতিবাদ করেন, বাইরে থেকে এসে কেউ বন দখলের প্রতিবাদ করেন না।

বিপাশা আফরিন বলেন, ময়লার কারণে গাজীপুর শহরের শিববাড়ী থেকে চৌরাস্তা পর্যন্ত নাক খুলে শ্বাস নিতে পারেন না শুধুমাত্র ময়লার ভাগাড়ের জন্য। গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার আব্দুল্লাহ মৃধা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাশ দিয়ে খালের পানিতে বিষাক্ত বর্জ্য প্রবাহিত হচ্ছে। তার প্রভাবে গবেষণাগারের মাছের মধ্যে এমন রোগ হয় যা টেস্ট করে পাওয়া যায় না। অর্গানিক পরিবর্তন করে এমনটি হয়েছে। গরুর জন্য চাষ করা ঘাসের মধ্যে এমন কিছু বিষ দেখা গেছে যা গাভী খাওয়ার পর দুধ পর্যন্ত বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। তিনি পরিবেশ দূষণে এসবের প্রতিকার দাবি করেন।

বাড়ীয়া গ্রামের মোসলেম উদ্দিন বলেন, বাড়ীয়ার নদী ও খালগুলোর পানি দিয়ে আগে চাষাবাদ করা হতো। পানি বিষাক্ত হওয়ায় এখন ধানের চারা বা যে কোনো ফসলের চারা পঁচে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক মাছগুলো এখন আর চোখেও দেখা যায় না।

শ্রীপুর উপজেলা নদী পরিব্রাজক দলের সহ-সভাপতি মহসীন বলেন, ব্যাটারি কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া ও বর্জ্যে কেওয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ ওই এলাকার মানুষ অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছে ওই কারখানার আশপাশের লোকদের পরীক্ষা করে দেখা গেছে ২০ ভাগ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন।

আরও পড়ুনঃ  কৃষিখাতে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

গাজীপুর মহানগরের সাহাপাড়া এলাকার বাসিন্দা কাজী বদরুত আলম মনির বলেন, গাজীপুর শহরের জোড়পুকুর, সিটি করপোরেশন ভবনের উত্তর পাশের পুকুর, ফায়ার সার্ভিস অফিস সংলগ্ন টাঙ্কিরপাড়া পুকুর, কালীবাড়ী পুকুর, রাণী বিলাসমনি পুকুরের মধ্যে বেশ কয়েকটি দখল এবং কিছু মৃতপ্রায় হয়ে উঠেছে।

জেলে আব্দুল খালেক বলেন, আগে গাজীপুরের জলাশয়গুলো থকে মাছ ধরে বিক্রি করে সংসার চালাতাম। এখন এসব জলাশয়ে মাছ পাওয়া যায় না। পেশাও পরিবর্তন করতে পারছি না। খুব দুঃখ কষ্টে দিনাতিপাত করছি।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আনিছুর রহমান শুনানিতে অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করে বলেন, জেলায় সরকারের একজন প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর অনেক দায় রয়েছে। গত তিরিশ বছরে গাজীপুরে অর্থনৈতিক ট্রান্সফরমেশন হয়েছে। আগে জলাশয়ের যে প্রবাহ খাল বিলে ছিল এখন আর নেই। তাঁর সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে দোষীদের নিবৃত করার চেষ্টা করেছেন। মোগরখালের একটি অংশে ব্যক্তিগত জায়গা রয়েছে। আমরা সেটি খুলে দিতে পারিনি।

একটি গণমাধ্যমের উদ্ধৃতি ডিসি বলেন, সিটি করপোরেশনের ২০৬টি পুকুর বেদখল হয়ে গিয়েছিল। সেখানে ইতোমধ্যে আমরা ৮টি পুকুর উদ্ধার করেছি। আমার কাছে এনফোর্স করার মতো সুযোগ রয়েছে কিন্তু সাসটেইন করার মতো বাজেট আমার কাছে নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে মিটিং করে সকল পুকুরগুলোকে একটি প্রকল্পের আওতায় এনে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। জেলা প্রশাসন হাজার হাজার ইস্যু নিয়ে কাজ করছে। সেখানে সাসটেইন করার দায়িত্ব তিনি জনসাধারণকে নেয়ার আহবান জানান। মানুষের সম্পৃক্ততা ছাড়া গাজীপুরের সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

আনন্দবাজার/শহক

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন