রবিবার, ২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১২ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

ভয়ের বন্যায় নতুন বিপদ

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় দুই রাজ্য আসাম ও মেঘালয়ে ভারী আর অতিভারী বর্ষণের কারণেই হঠাৎ বন্যায় ডুবে গেছে সিলেটসহ বিভাগীয় জেলাগুলো।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় দুই রাজ্য আসাম ও মেঘালয়ে ভারী আর অতিভারী বর্ষণের কারণেই হঠাৎ বন্যায় ডুবে গেছে সিলেটসহ বিভাগীয় জেলাগুলো। আবার উজানে ভারী বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলের কারণেই দেশের উত্তরজনপদের জেলাগুলোর নদনদী উপচে উঠে বন্যায় প্লাবিত করছে দুই পাড়ের জনপদ, ঘরবাড়ি ফসলি জমি। এমন পরিস্থিতির মধ্যে আবার গত কয়েকদিন ধরে বন্যাদুর্গত এলাকাতে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে বন্যার ভয়াবহতা বেড়ে গেছে। যদিও গতকাল সোমবার থেকে সিলেট বিভাগের নদ-নদীতে পানি প্রবাহ করে গেছে। সেই সঙ্গে বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থেকে গেছে।

তবে বিপদ বাড়াচ্ছে উজানে ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস। এমনিতেই ভারতের আসাম মেঘালয় রাজ্যে বন্যা পরিস্থিতির কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। স্থানীয় সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম বলছে, শনিবার থেকে রবিবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দুই রাজ্যে বন্যার ছোবলে আরও ১১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্য আসামে ৯ এবং মেঘালয়ে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত মে আর চলতি জুন মিলে দুই রাজ্যে শুধু বন্যার কারণেই প্রাণ হারালেন অন্তত ১১১ জন।

এমনকি আসামের পাশের রাজ্য মেঘালয়ে বন্যায় ভূমিধসের কারণে দুটি মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েক লাখ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা বন্যা ও ভূমিধসের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে বলেছেন, ক্ষতি পোষাতে তিনি কেন্দ্র সরকারের কাছে ৩০০ কোটি রুপি চেয়েছেন। বন্যায় আটকা পড়া মানুষকে সহায়তায় সরকারি সব সংস্থা কাজ করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসাম ও মেঘলয়ে ভারী বর্ষণ হলে বিপদ বাড়বে ভাটি অঞ্চলে। বিশেষ করে সিলেট ও আশপাশের জেলাগুলোতে। তবে ভারতীয় সূত্রগুলোর মতে, খুবই শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। দুই রাজ্যে আরও ভারী বর্ষণের আশঙ্কা করছেন আবহাওয়াবিদরা। সেই সঙ্গে ভাটি অঞ্চল সিলেট বিভাগেও আরও ভারী বর্ষণ হতে পারে বলে জানাচ্ছেন বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

আরও পড়ুনঃ  বদলাতে হবে রাজস্ব কাঠামো

এদিকে, এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আসাম ও মেঘালয়ে গতকাল সোমবারও ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস বলবৎ রেখেছে ভারতের আবহাওয়া বিভাগ (আইএমডি)। পূর্বাভাসে আইএমডি ওই দুই রাজ্যে ইতোমধ্যে অরেঞ্জ (কমলা) সতর্কতা জারি করেছে। বাস্তবতা হচ্ছে, আসামের বন্যা পরিস্থিতি আরও বেশি মারাত্মক হচ্ছে। নতুন করে অনেক এলাকা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। খবরে বলা হচ্ছে, গত ২৪ ঘণ্টায় আসামের ৩২টি জেলার ৪ হাজার ২৯১টি গ্রাম পানিতে প্লাবিত হয়েছে। খুব ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা তো রয়েছেই। তার ওপর কমলা সতর্কতা জারির কারণে ক্ষয়ক্ষতির ভয় বাড়ছে। সবাইকে প্রস্তুত থাকার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

আবার বাংলাদেশেও ভয় বাড়ছে ভারী ও অতিভারী বর্ষণের পূর্বাভাসে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী এক সপ্তাহ সিলেটে বৃষ্টি কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। একইরকম পরিস্থিতি থাকবে চট্টগ্রাম–বরিশাল বিভাগে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণের উপকূলীয় এই দুই বিভাগে আগামী ২৯ জুন পর্যন্ত ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে। এই সময়ের মধ্যে মধ্যাঞ্চলের বন্যার পানি গিয়ে দক্ষিণে জমা হতে থাকবে। সেখানে ভারী বর্ষণ হলে বিপদে পড়তে হবে উপকূলীয় জেলার বাসিন্দাদের। আগামীকাল বুধবার থেকে সারাদেশে বৃষ্টির মাত্রা আরও বাড়তে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মনোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আগামী ২৯ জুন পর্যন্ত সিলেট বিভাগে বৃষ্টি কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। আর ভারী বৃষ্টি হলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতিরও কোনো সম্ভাবনা নেই। ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হবে চট্টগ্রাম–বরিশালেও। আবহাওয়ার এই সতর্কতার মধ্যেই বন্যাদুর্গত এলাকাগুলোতে খাদ্য আর বিশুদ্ধ পানির ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে এসব সংকট ছাড়াও নানামুখী দুর্ভোগ বেড়েছে।

আরও পড়ুনঃ  পরিবেশবান্ধব ইটে হতাশা

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, মৌসুমী বায়ু বাংলাদেশের উপর সক্রিয়। উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় রয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়, রংপুর, ময়মনসিংহ, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১ থেকে ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিকে হালকা, ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটারকে ভারী এবং ৮৮ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিকে অতিভারী বৃষ্টি বলা হয়। গতকাল সোমবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুসারে, গেল ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে চট্টগ্রামে- যা রেকর্ড করা হয়েছে ২৪২ মিলিমিটার। বরিশালে ৮৩ মিলিমিটার আর সামান্য বৃষ্টি হয়েছে ঢাকায়। অন্যদিকে আবার ভারতের চেরাপুঞ্জিতে সর্বোচ্চ ১২২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া অরুণাচলের পাসিঘাটে ৬৪ এবং ত্রিপুয়ার আগরতলায় ৬১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।

আবহাওয়া সংস্থাগুলোর গাণিতিক মডেলভিত্তিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং ভারতের আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও হিমালয় পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গের স্থানসমূহে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। ফলে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, গঙ্গা-পদ্মা, ধরলা ও দুধকুমারসহ সব প্রধান নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশের সব প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আনন্দবাজার/শহক

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন