সোমবার, ১৭ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

সংকট সমাধানে বহুপাক্ষিকতা

সংকট সমাধানে বহুপাক্ষিকতা

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, করোনা পরবর্তী বিশ্বে বহুমুখী আর্থ-রাজনৈতিক সংকট, খাদ্যপণ্যে অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতিসহ বৈশ্বিক অর্থনীতি এখন অনেকটাই টালমাটাল। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী সংহতি জোরদার, কার্যকর খাদ্য সঞ্চয়, বিদ্যুৎ ও আর্থিক সংকট মোকাবিলায় সুসমন্বিত পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গত শুক্রবার রাতে জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে প্রথমবারের মতো ‘চ্যাম্পিয়নস গ্রুপ অব গ্লোবাল ক্রাইসিস রেসপন্স ফর ফুড, এনার্জি অ্যান্ড ফাইন্যান্স’ এর বৈঠকে গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে চারটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে সৃষ্ট চলমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার লক্ষ্যে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গঠন করেছেন গ্রুপটি।

বৈঠকে উত্থাপন করা শেখ হাসিনার প্রথম প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আমাদের বৈশ্বিক সংহতি জোরদার করতে হবে এবং সুসমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে জি-৭, জি-২০, ওইসিডি এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরু দায়িত্ব রয়েছে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি দেখে খুশি হয়েছি যে, এই গ্রুপের স্টিয়ারিং কমিটিতে প্রধান সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশগুলো তৈরির জন্য আমরা তাদের পূর্ণ সমর্থন দেব।

দ্বিতীয় প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাৎক্ষণিক প্রয়োজন হল বৈশ্বিক লজিস্টিক এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত মোকাবিলা করা। এটা পণ্যের ক্রমবর্ধমান মূল্য নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে। বিষয়টি বিশ্লেষণ করে বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং রপ্তানি আয় পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সমর্থনও থাকতে হবে। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ এবং অন্যান্য দুর্বল দেশগুলির জন্য। এছাড়া, উন্নত অর্থনীতি ও বহুপাক্ষিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে এবং শুল্কমুক্ত-কোটামুক্ত বাজারে প্রবেশাধিকার এবং আরও সহজলভ্য আর্থিক ব্যবস্থা থাকতে হবে।

আরও পড়ুনঃ  ৫ মে পর্যন্ত বেড়েছে সাধারণ ছুটি

তৃতীয় প্রস্তাবে শেখ হাসিনা বলেন, কার্যকর খাদ্য সঞ্চয় ও বিতরণ ব্যবস্থার জন্য কৃষিখাতের জন্য প্রযুক্তি সহায়তা এবং বিনিয়োগের ওপর আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া জরুরি। প্রধানমন্ত্রী এ সম্পর্কে বলেন, নবায়যোগ্য জ্বালানিখাতে, বিশেষ করে এলডিসিগুলোতে (স্বল্পোন্নত দেশ) ব্যবসার ক্ষেত্রে আনকোরা অনেক সুযোগ রয়েছে। এই বিষয়গুলো এগিয়ে নিতে বিদ্যমান উত্তর-দক্ষিণ, দক্ষিণ-দক্ষিণ এবং ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে’।

চতুর্থ প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র (এসআইডি) এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নাঞ্চলীয় দেশগুলোর জন্য কাজের সুযোগ পাওয়ার কথা তুলে ধরেন।
শেখ হাসিনা বলেন, সেসব দেশে কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থা গুরুতর চাপের মধ্যে রয়েছে। এ সময় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের উদ্যোগ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের জাতীয় উন্নয়ন যাত্রায় উদ্ভাবনী অনেক জলবায়ু কার্যক্রম রয়েছে। আমরা অন্যদের সুবিধার জন্য জলবায়ু পরিবর্তন, জীব-বৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং পরিবেশগত অবক্ষয়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের জ্ঞান, বোঝাপড়া এবং অভিজ্ঞতা তাদের জানাত চাই।

বাংলাদেশের সরকারপ্রধান বলেন, বাংলাদেশ বহুপাক্ষিকতায় দৃঢ় বিশ্বাসী। আমরা সব সময় বৈশ্বিক শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য জাতিসংঘের আহ্বানে সাড়া দিয়েছি। জাতি হিসেবে ভয়ঙ্কর সব চ্যালেঞ্জের মুখেও আমাদের সহনশীলতার পরিচয় রয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারি তার সর্বশেষ উদাহরণ। বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিকে অত্যন্ত অস্থিতিশীল করে তুলেছে। সরবরাহের স্বল্পতা এবং খাদ্য, জ্বালানিসহ অন্যান্য পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে।

আরও পড়ুনঃ  কোরবানির বাজেটে কাটছাঁট

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্বকে দুইভাগে বিভক্ত করে ফেলেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে প্রস্তাব দিয়েছেন তা বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার পথ দেখাবে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংকটের সমাধান পুরোটাই নির্ভর করছে বিশ্বনেতাদের দৃষ্টিভঙ্গি আর শুভ বোধের ওপর। বৈশ্বিক সংকট নিয়ে যারা আলোচনা করছেন, তারা বলছেন, বিশ্ব এখন যে সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে তা কোনো একক রাষ্ট্রের সমস্যা নয়। বরং গোটা বিশ্বই এই সংকটের নেতিবাচকতার শিকার হচ্ছে। সেজন্য জাতিসংঘ মহাসচিব যে উদ্যোগ নিয়েছেন তা যেমন সংকট উত্তরণে বিশ্বনেতাদের অংশগ্রহণে আগ্রহী করবে, তেমনি সম্মিলিত প্রয়াস নিতে ভূমিকা রাখবে।

বৈশ্বিক সংহতি জোরদার করা এবং সুসমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ বিষয়ে বাংলাদেশের সরকার প্রধান যে প্রস্তাবটি দিয়েছেন সে বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের চেয়ারম্যান অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ফজলুল হালিম রানা বলেন, বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার জন্য প্রথম প্রস্তাবটি খুবই যুগোপযোগী। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা দেশসহ শক্তিধর দেশগুলো এক না হলে এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।

দৈনিক আনন্দবাজারকে তিনি বলেন, সমস্যার অপর পৃষ্ঠাতেই সমাধান। কেননা যুদ্ধটি কেন্দ্র করে বিশ্ব যেমন দুইভাগে চলে গেছে এটি সমাধান করতে হলে তাদের একই টেবিলে বসে ঐক্যমত হতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবটি ভালো হলেও এটির বাস্তবায়নের আশা ক্ষীণ। আমরা চাইবো বিশ্ব সংহতি জোরদার হোক। প্রস্তাবটি আলোর মুখ দেখুক।

দ্বিতীয় প্রস্তাব সম্পর্কে প্রফেসর ফজলুল হালিম রানা বলেন, বিশ্ব ব্যাংক, আন্তর্জাতিক মনিটারি ফান্ডসহ বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এখানেও বিশ্ব শক্তিগুলোকে সহমতে আসতে হবে। এ দুটি প্রস্তাব বাস্তবায়ন সম্পূর্ণ নির্ভর করছে বিশ্বনেতাদের সদিচ্ছার ওপর।

আরও পড়ুনঃ  ভ্যাকসিন নিয়েও বিশ্বে করোনায় মৃত্যু ১০ লাখ

অনুন্নত দেশগুলোতে খাদ্য বিতরণ, প্রযুক্তি হস্তান্তরসহ প্রস্তাবটি কৃষিপ্রধান, দুর্ভিক্ষপীড়িত ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে আশার পথ দেখাবে বলেও মনে করছেন ফজলুল হালিম রানা। তা ছাড়া চতুর্থ প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত যেসব বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন তা নিঃসন্দেহে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে মাথাচাড়া দিয়ে দাঁড়াতে সাহস জোগাবে। কেননা এসব দেশ অন্যের কারণে ভুক্তভোগীতে পরিণত হয়েছে।

এই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের দাবি, এসব প্রস্তাব উত্থাপন করে দেশকে আরো সম্মানিত করেছেন শেখ হাসিনা। তার দুদর্শিচিন্তার আলোকে বিশ্বনেতৃত্ব প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করলে বৈশ্বিক সম্প্রীতি মজবুত হবে।

প্রধানমন্ত্রীর দেয়া চতুর্থ প্রস্তাব সম্পর্কে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশানোগ্রাফি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন মুন্না দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজণিত কারণে অনেক মানুষ নিজের চিরাচরিত কাজ বা পেশা হারাচ্ছে। লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে কৃষিসহ স্থানীয় ফসল ফলানো হুমকির মুখে পড়েছে। এই পরিবেশদূষণ সৃষ্টিতে মূলত উন্নয়ত দেশগুলো দায়ী। তাদের কার্বন উদগীরণের ফলেই বিশ্ব আজ হুমকির মুখে পড়েছে।

ড. মুন্না বলেন, প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নাঞ্চলীয় দেশগুলোর জন্য কাজের সুযোগ পাওয়ার যে প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন তা প্রশংসনীয়। তবে আমাদের কথা হচ্ছে এই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশের কী পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে, একইসঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করে ক্ষতিপূরণ চাওয়া দরকার।

আনন্দবাজার/শহক

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন