শুক্রবার, ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

মৎস খামারে ক্রেতা সংকট

মৎস-খামারে-ক্রেতা-সংকট

গত দেড় দশকে ময়মনসিংহের বিভিন্ন উপজেলায় সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানায় গড়ে উঠা মৎস্য খামারে মাছ চাষে নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। মাছ উৎপাদনে সারাদেশে দীর্ঘ সাত বছর ধরে প্রথমস্থান ধরে রেখেছে জেলাটি। দেশের মোট চাহিদার প্রায় ১২ শতাংশ উৎপাদন হয় এখানে। বর্তমানে জেলায় ৪ লাখ টন মাছ উৎপাদন হচ্ছে। জেলার চাহিদা মিটিয়েও উদ্বৃত্ত থাকছে ২ লাখ ৭০ হাজার টন।

তবে সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা না থাকা, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া ও মাছের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় আর্থিক লোকসানে পড়েছেন চাষিরা। এর ওপর করোনা মহামারির কারণে গত দুই বছরে হ্যাচারিতে রেণু পোনা উৎপাদন এবং খামারে মাছের উৎপাদন অনেকটাই হ্রাস পাচ্ছে। যদিও মৎস্য অধিদপ্তর এমন অভিযোগ মানতে নারাজ। তারা বলছে, করোনাকালে মাছের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সব ধরণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

জেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ময়মনসিংহ জেলায় প্রায় এক লাখ ১২ হাজার মাছ চাষি রয়েছেন। নিবন্ধিত হ্যাচারি ৩১৭টি। হ্যাচারিগুলোতে প্রতিবছর এক লাখ ৮০ হাজার কেজি রেণু পোনা উৎপাদন হয়। আর মাছ উৎপাদন হয় প্রায় ৪ লাখ টন। জেলার ৫৩ লাখ জনগোষ্ঠির মাছের চাহিদা রয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার টন। ফলে বছরে উদ্বৃত্ত থাকে ২ লাখ ৭০ হাজারটন। এসব মাছ চলে যায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলাগুলোতে। তবে গত বছর দেড়েক (জুন ২০২১ পর্যন্ত) করোনার কারণে উদ্বৃত্ত মাছ সময়মতো বিক্রি না হওয়ায় লোকসানের মুখে পড়ছেন চাষিরা।

আরও পড়ুনঃ  রমাজানের জন্য ৬৫ হাজার মেট্রিক টন চিনি মজুদ

জেলা মৎস্য অফিসের হিসেবেই জেলায় করোনাকালীন ৫৮ হাজার ৪৬৭ জন মৎস্যচাষি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের হিসেবে করোনাকালীন ক্ষতির পরিমাণ ৩৩৫ কোটি ২ লাখ টাকার ওপরে। এতে জেলার প্রায় ৬০ হাজার মৎস্যচাষির গুণতে হয়েছে ৩৩৫ কোটি টাকা লোকসান।

ময়মনসিংহ সদরের ব্রহ্মপুত্র ফিশ এন্ড হ্যাচারির স্বত্ত্বাধিকারী নূরুল হক দৈনিক আনন্দবাজারকে জানান, সিলেট, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মবাড়িয়া, রাজশাহী, রংপুরসহ বিভিন্ন জেলায় এ অঞ্চলের রেণু পোনার বিশাল চাহিদা রয়েছে। তবে এসব অঞ্চলে বর্তমানে ২৫ থেকে ৩০ ভাগ চাহিদা কমে গেছে। বিগত মৌসুমে লোকসানের আশঙ্কায় অনেক হ্যাচারি মালিক রেণু উৎপাদনে আসেননি। করোনাকালীন যারা ঝুঁকি নিয়ে রেণু উৎপাদন করেছে তাদের প্রায় সবাই লোকসানে পড়েছে। তাছাড়া খৈল-কুড়া ও বাজারে খাদ্যের মূল্য অনেক বেশি। মাছের উৎপাদন খরচের সঙ্গে বর্তমান বাজার দরের কোনো মিল নেই।

ময়মনসিংহ সদরের পোনা উৎপাদনকারী হ্যাচারি মালিক এখলাস উদ্দিন দৈনিক আনন্দবাজারকে জানান, আমার হ্যাচারি থেকেই বছরে ৪ থেকে ৫ কোটি পোনা উৎপাদন ও বিক্রি করা হতো। দেশের বিভিন্ন জেলায় রেণু পোনা সরবরাহ করতাম। বিগত মৌসুমে অর্ধেকেরও কম রেণু উৎপাদন করেও অপেক্ষাকৃত কম মূল্যেও পোনা বিক্রি করতে কষ্ট হয়েছে।

ঈশ্বরগঞ্জের খান মৎস্য খামারের মালিক সুজন খান দৈনিক আনন্দবাজারকে জানান, করোনার আগে শিং, মাগুর, পাবদা (২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজি) ১৬ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা মণে বেচাকেনা হতো। বর্তমান বাজারে সেই মাছ ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা মণে বিক্রি করতে হচ্ছে। বর্তমান বাজার দরের সঙ্গে মাছের উৎপাদন খরচের মিল নেই। করোনাকালীন লোকসানের কারণে অনেকেই পুঁজি হারিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছেন।

আরও পড়ুনঃ  বীমার টানে উত্থানে পুঁজিবাজার

ময়মনসিংহ সদর উপজেলার মাঝিহাটি গ্রামের এমএ রায়হান রায়হান দৈনিক আনন্দবাজারকে জানান, দেশে মাছের বাজার কমে গেলে মাছের খাদ্য ও মাছ উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব ধরণের জিনিসের দাম বাড়ে। তখন চাষিদের অপেক্ষাকৃত কমমূল্যে মাছ বিক্রি করে বেশি দামে খাদ্য কিনে মাছকে খাওয়াতে হয়।

বাংলাদেশ ফিশ হ্যাচারি এন্ড ফার্ম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা এম এ বাতেন দৈনিক আনন্দবাজারকে জানান, সরকারি হিসেবে জেলায় এক লাখ ১২ হাজার মাছ চাষির কথা বলা হলেও বাস্তবে সেই চাষির সংখ্যা অনেক বেশি। সরকার নিবন্ধিত হ্যাচারি ৩১৭টির কথা বলা হলেও বাস্তবে এর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। ময়মনসিংহ অঞ্চলে যে পরিমাণ মাছ উৎপাদন হয় তা দিয়ে এ এলাকার চাহিদা মিটিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন নগর ও জেলা শহরে বিক্রি করা হয়। বিগত একবছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কোচিং সেন্টার বন্ধ ছিল। শহরের অনেক মানুষ গ্রামে চলে যাওয়ায় রাজধানীসহ শহর, বন্দর ও নগরীতে মাছের চাহিদা অনেকটা কম ছিল। সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে মৎস্য চাষে যখন একটু সুবাতাস বইতে শুরু করেছে ঠিক তখনই করোনা চোখ রাঙানি। সরকার যদি স্বল্প সুদে অথবা প্রণোদনা আকারে হ্যাচারি মালিকদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করে তাহলে ব্যবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে। অন্যথায় হ্যাচারি ও মাছের ব্যবসায় যে ধস নেমেছে তা কাটিয়ে উঠা কঠিন হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই’র) মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ দৈনিক আনন্দবাজারকে আরো জানান, সারাদেশে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইনস্টিটিউটের গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। মৎস্যচাষীদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যহত রয়েছে। ২০০৮-০৯ সালে দেশীয় ছোট মাছের উৎপাদন ছিল ৬৭ হাজার টন। গত ১২ বছরে পুকুরে দেশীয় মাছের উৎপাদন প্রায় চারগুণ বেড়ে আড়াই লাখ মে. টন হয়েছে। তাছাড়াও বিলুপ্তপ্রায় মাছ পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে কাজ করছে বিজ্ঞানীরা।

আরও পড়ুনঃ  অভিনব দূরত্ব কৌশল মেনেই দুধ বিক্রি

ইতোমধ্যে বাংলাদেশে স্বাদুপানির ২৬০টি মাছের মধ্যে ৬৪ প্রজাতি বিলুপ্তপ্রায়। এরমধ্যে ৯টি অতিবিপন্ন, ৩০টি বিপন্ন এবং ২৫টি বিপন্নের পথে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ইতোমধ্যে ৩১টি বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রজনন ও চাষাবাদ কৌশল উদ্ভাবন সক্ষম হয়েছে। বেশ কয়েকটি প্রজাতি ইতোমধ্যে চাষী পর্যায়ে চাষ হচ্ছে এবং চাষীরা বেশ সাফল্যও পেয়েছেন।

ময়মনসিংহ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা দিলীপ কুমার সাহা দৈনিক আনন্দবাজারকে জানান, চলমান করোনার প্রভাবে জেলায় মাছের উৎপাদনে কোনো ঘাটতি হয়নি। বরং প্রতিবছর জেলার চাহিদা পূরণ করে আরো ২ লাখ ৭০ হাজার টন উদ্বৃত্ত হয়। করোনার কারণে জেলার ৫৮ হাজার ৪৬৭ জন মৎস্যচাষি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের নামের তালিকা মোবাইল নম্বরসহ মৎস্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত প্রণোদনার ৩০ কোটি টাকা (৪ শতাংশ সুদে) জেলার অনেক চাষি পেয়েছেন।

আনন্দবাজার/শহক

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন