শুক্রবার, ২১শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

খাদ্যপণ্যের উত্তাপ সংসারে

খাদ্যপণের উত্তাপ সংসারে

বাজারে যাই ভয়ে ভয়ে। পকেটের টাকায় কুলাবে তো? আজ এই জিনিসের দাম বাড়ছে, তো কাল আরেকটার। হিসাব কোনোভাবেই মেলাতে পারি না। যা দরকার তা কি আর কিনতে পারি? বাজার থেকে ঘরে ফিরেই কথা শুনতে হয় বৌয়ের। আজকাল পরিবারের সবার মেজাজই খিটখিটে হয়ে গেছে। আমার এত সুখের সংসার, এত ভালোবাসা, মায়া-মমতা, স্বপ্ন- সব অশান্তির আগুনে পুড়ছে…। এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর বাংলামোটরে ইস্কাটন জামে মসজিদের পাশে টং দোকানের চা বিক্রেতা হানিফ মিয়া। দোকানে বসেই কথা হয় দৈনিক আনন্দবাজারের প্রতিবেদকের সঙ্গে।

চা বানানোর উপকরণের দাম বাড়ার বিষয় উল্লেখ করে হানিফ মিয়া বলেন, চা পাতা আর চিনির দামও তো বেড়েছে। কিন্তু যদি চায়ের দাম বাড়িয়ে দিই তাহলে তো লোকে চা খাওয়া বন্ধ করে দেবে। তখন চলবো কী করে? খানিকটা ক্ষোভ প্রকাশ করে হানিফ মিয়া বলেন, আয় রোজগার তো বাড়ে না, খালি খরচই তো বেড়ে যায়। কীভাবে সংসার চলবে বলতে পারেন?

দুই ছেলে এক মেয়ের বাবা হানিফ মিয়ার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। কিছুদিন আগেও ছিলেন ইস্কাটন মসজিদের পাশের বস্তিতে। এখন পরিবার নিয়ে থাকেন শেওড়াপাড়ায়। সুখের সংসারে স্বপ্ন তার অনেক বড়। সেই স্বপ্নের মোহে বস্তিতে থেকে বড় ছেলেকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং আর মেয়েকে অনার্স পর্যন্ত পড়িয়েছেন। ছেলে মেয়ে দুজনেই এখন চাকরি করছেন। ছেলের বেতন একটু কম। মাস দুয়েক আগে ছেলের বিয়ে দিয়েছেন হানিফ মিয়া। তবে বউকে তো আর বস্তিতে আনতে পারেন না; তাই শেওড়াপাড়ায় ছোট্ট এক বাসা ভাড়া নিয়েছেন। সেই বাসাতেই তার তার সুখের সংসার। ছোট ছেলেকেও মানুষ করার জন্য পড়াচ্ছেন। তার এই স্বপ্নভরা সুখের সংসারে এখন অশান্তির আগুন ধরিয়ে দিয়েছে খাদ্যপণ্যের দামের আগুন।

আরও পড়ুনঃ  ডিজেলের বাড়তি দাম, লোকসানে শিল্প উদ্যোক্তারা

কিছুটা ক্ষোভ আর হতাশায় হানিফ মিয়া বলেন, আগে চাল ডাল সয়াবিনের দাম বাড়লে টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য কিনতাম। এখন তো সেই ট্রাকের দেখাও পাচ্ছি না। কি আর করা, বাজার থেকে বেশি দামেই কিনতে হয় চাল, ডাল, সয়াবিন সবজি। কিন্তু বাজারে প্রতিদিন যে হারে দাম বাড়ছে তাতে এখন পাগল হওয়ার বাকি আছে। ভালো কথাও এখন সবার কাছে তিতা লাগছে। একটুতেই রেগে যাচ্ছে সবাই।

হানিফ মিয়ার মতোই বাজারের নিত্যপণ্যের দামের চাপে কাতর রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করা দিনমজুর মন্টু মিয়া। তার সঙ্গে কথা হয় রাজধানীর ফার্মগেটে। খানিকটা হতাশার সুরেই প্রতিবেদককে বলেন, দিনে যা কামাই করি, তা দিয়ে বাজার খরচে কুলিয়ে উঠতে পারি না। স্ত্রী সন্তানদের প্রয়োজন মেটাতে পারি না। ছেলেটা পাঁচটা টাকার জন্য হাত পাতলেও দিতে পারি না।

মন্টু মিয়া যে আয় করেন আগের মতো সেই টাকায় আর চলে না। তবে আয়ও আর বাড়ছে না। এ নিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের প্রশ্নে জর্জরিত হতে হয়। তার স্ত্রী বলেন, সারাদিন কামাই করো, সে টাকা যায় কোথায়? এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন মন্টু মিয়া। প্রতিবেদককে বলেন, আগে যেখানে তেল কিনতাম এক লিটার, এখন কিনতে হয় এক বা আধা পোয়া। পেঁয়াজ কিনতে গিয়ে টাকা কুলায় না। বাকি জিনিস কীভাবে কিনব? কয়েকদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেও কমদামের ট্রাকের দেখা পাইনি। দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখি ট্রাকও পালাইছে। সরকার যে বলেছেন ১১০ টাকায় তেল দিবে, সেই তেলও তো পাচ্ছি না।

আরও পড়ুনঃ  করোনা আক্রান্তের এলাকা লকডাউনের নির্দেশ : প্রধানমন্ত্রী

কড়াইল বস্তির বেকার তরুণ আকরাম। চাকরি খুঁজছেন। দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, সবকিছুর দাম বাড়ে, অথচ মানুষের দাম বাড়ে না। নিজে তো উপার্জন করতে পারছি না। পরিবারের কাছে নিজেকে বোঝা মনে হচ্ছে। এখন বাজারে সব জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ায় সংসার খরচ বেড়েছে। আয় রোজগার না থাকায় প্রতিদিনই পরিবারে অশান্তির আগুনে জ্বলতে হচ্ছে।

তবে ভিন্ন কথা বললেন এলিফেন্ট রোডের ব্যবসায়ী আওলাদ হোসেন। তার সঙ্গে কথা হয় কাঁটাবনে। প্রতিবেদককে বলেন, বাজারে গেলেই মাথা খারাপ হয়। যা কিনতে চাই, যতটুকু কিনতে চাই পারি না। সেজন্য সংসারে কথা হয়, ঝগড়াঝাটিও হয়। সেজন্য ভেবেছি, আর নয়, সরকার যা করে সেটাই মেনে নেব। খাওয়াই কমিয়ে দেব। বাজার নিয়ে আর মাথা ঘামাই না। এতদিন যে চিন্তা করেছি সেটা ক্ষতিই হয়েছে নিজের।

কাঁটাবন এলাকায় বইপত্রের ডিজাইনের কাজ করেন সোহেল আহমেদ। তার সঙ্গে কথা হয় কনকর্ড টাওয়ারে। বলেন, সয়াবিনের দাম তো লাগাম ছাড়া। শুনছিলাম, সরকার ১১০ টাকা করে তেল দেবে। কিন্তু পরে শুনলাম আর দেবে না। ট্রাক নাকি বন্ধ করে দিয়েছে। কেন বন্ধ করে দিয়েছে জানি না। তবে ১১০ টাকায় তেল কিনতে পারলে অন্তত সংসারের খরচ কিছুটা তো কমতো।

রাজধানীর বাংলামোটরের পাম্পের গলির মুখের মুদি দোকানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করছেন বরিশালের ইব্রাহীম খলিল। জিনিসপত্রের দাম বাড়ার মধ্যে কেমন চলছে তার সংসার? এমন প্রশ্ন করতেই তিনি খানিকটা ক্ষুব্ধ হলেন। বললেন, সংসার তো খুব ভালো চলছে ভাই! দেশে কোনো সমস্যা নেই। আমাদের মাথাপিছু আয় তো অনেক। আমাদের ক্রয়ক্ষমতা তো বেড়ে গেছে। সরকারের লোকজন তো সবই বলে দিচ্ছে। তাহলে আমাদের সমস্যা থাকবে কেন?

আরও পড়ুনঃ  ‘হাঙ্গেরিকে করোনার টিকা দেবে বাংলাদেশ’

খানিক পরে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ইব্রাহীম খলিল প্রতিবেদককে বলেন, মনের দুঃখে কথাগুলো বললাম। আসলে দোকানে কাজ করে কত টাকা পাই বলেন? যেভাবে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে তাতে বেঁচে থাকাটাই বড় কথা। আমাদের মতো গরিবরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাকের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকার পরেও তো কম দামে কিছু জিনিস কিনতে পারতাম। কিন্তু অনেকদিন ধরে সেই ট্রাকের দেখা পাচ্ছি না।

রাজধানীর নিউইস্কাটনে বিগত তিন দশক ধরে জুতা সেলাইয়ের কাজ করছেন আতিক। কাজ করার ফাঁকে ফাকে তিনি কথা বলেন প্রতিবেদকের সঙ্গে। দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, জিনিসপত্রের দাম বাড়লে আগে খুব চিন্তা করতাম। সরকারের ওপর রাগ হতো। তবে এখন দেখি সবই সয়ে গেছে। এখন সব চিন্তা বাদে নিজের কাজের দিকে বেশি নজর দিই। ওইসব চিন্তার করার চেয়ে বেশি কাজ করলে দুটো পয়সা বেশি আয় হয়। তাতে পরিবার নিয়ে অন্তত খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকতে পারি।

চার সন্তানের বাবা আতিক বলেন, আগে টাকা বাঁচানোর জন্য টিসিবির ট্রাক থেকে চাল, ডাল, সয়াবিন কিনতাম। এমনকি ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও থাকতাম। তবে এখন আর ট্রাকের পিছনে যাই না। শুনলাম, ১১০ টাকায় তেল দেবে টিসিবির ট্রাক। কিন্তু পরে শুনলাম, সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। আসলে গরিবের সুখবরের মধ্যে দুঃসংবাদ থাকে সব সময়। তাই কেউ আমাদের জন্য ভালো করুক, ভালো ভাবুক সেটা ভাবার আর দরকার মনে করি না।

আনন্দবাজার/শহক

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন