বুধবার, ২২শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

‘চিয়া’ বীজে লাভ ৬ গুণ বেশি

‘চিয়া’ বীজে লাভ ৬ গুণ বেশি

বিস্তীর্ণ জমিতে গাঢ় সবুজ রঙের গাছ দুলছে। প্রতিটি গাছ লম্বায় প্রায় তিন ফুট। গাছে বেগুনি রঙের ফুল এসেছে। এসেছে গুটি গুটি ফলও। এর নাম চিয়া বীজ।

দক্ষিণ আমেরিকা ও মেক্সিকোর ওষুধি গুণসম্পন্ন, মানবদেহের জন্য পুষ্টিকর এ শস্যদানা রংপুরের কাউনিয়ার হারাগাছে প্রথমবারের মতো চাষ হচ্ছে। পাঁচ একর জমিতে চাষ হওয়া এ বিদেশি ফসল প্রথমবারেই আশানুরূপ হয়েছে বলে দাবি চাষি এবং কৃষি সংশ্লিষ্টদের। চিয়া বীজের বাম্পার ফলনে অনেক চাষি এই বীজ চাষে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

কৃষি বিভাগ জানায়, চিয়া বীজ রোপণের জন্য জমি দু’ভাবে প্রস্তুত করতে হয়। প্রতি বিঘায় ১০ কেজি টিএসপি, ১০ কেজি পটাশ, পাঁচ কেজি জিপসাম, ২ কেজি ব্রোন সার ও বীজ লাগে ৩ কেজি। প্রতি শতকে বীজ উৎপাদন হয় ৩ থেকে ৪ কেজি। বিঘায় উৎপাদন হয় অন্তত ১২০ কেজি। সে অনুযায়ী বিঘায় খরচ হয় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা। উৎপাদন হয় অন্তত ৪৮ হাজার টাকার বীজ।

কৃষি বিভাগের তত্ত্বাবধায়নে পরীক্ষামূলকভাবে চিয়া বীজ চাষ করেন রংপুরের হারাগাছের জহুরুল ইসলাম বাবু। স্বল্প খরচে চিয়ার ব্যাপক ফলনের আশা করছেন তিনি।

বলেন, ‘ওরা (কৃষি বিভাগ) বলেছে বীজটা ভালো, আবাদ করতে খরচও কম। তাই রাজি হইসি। জমিতে চাষ করেছি। এখন দেখছি বেশ ভালো হয়েছে আবাদ। অনেকেই এখন এ বীজ আবাদ করতে চায়।’

প্রতিবেশী চাষি মিজানুর ইসলাম বলেন, গত বছর ডিসেম্বরের ৪ তারিখে আমরা এর বীজ বপণ করছি। বীজ বপণ করার পর ছোট ছোট গাছ গজি উঠল। ইউরিয়া দিয়া তারপর ছিটানো পানি দিছি, তার কয়েকদিন পর ঢালা পানি দিয়ে আবার ইউরিয়া দিছি, তার পর দুই একবার কিটনাশক স্পে ব্যবহার করছি, এখন ফুলও আসছে। আবাদ খুব ভালো হইসে। অন্য ফসলের চাইতে এই ফসলটা ভালো হইসে। খরচও কম।

আরও পড়ুনঃ  সজীবের জৈব সার কারখানায় সাড়া

রেজাউল করিম নামে আরেক চাষি বলেন, আমার তো এর আগোত (আগে) এ চিয়া চাষ করি নাই। এইবার করছি। তো জমিত তেমন খরচ নাই, পরিশ্রমও নাই। ফসল তো ভালো হইসে। মারাকাটাই করি দেকা লাগবে। তবে কষ্ট কম, আবাদও ভালো হইসে, মনে হয় অনেক লাভ হইবে।

নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ফলন ভালো হওয়া দেকি এ্যালায় মেলা কিষক (কৃষক) আইসে। বলে বীজ তুলি হামাকো দেন। হামরা গারমো। মনে হয় এ এলাকায় সামনের বার অনেক মানুষ এই বীজ গারবে। ভালো হয়ে আমরাও করব।

গারাগাছ ইউনিয়ন সহকারী কৃষি কর্মকর্তা (বিএস) আল আমিন বলেন, চিয়া বীজ রোপনের ৯০ দিনের মধ্যে গাছে ফুল আসে। ১২০ দিনের মধ্যে এটি হারভেস্ট করা যায়। এই গাছের উচ্চতা দুই থেকে তিন ফুট হয়। প্রতি বিঘা জমিতে আট থেকে দশ হাজার টাকা খরচ হয়, যেখানে শতকে তিন থেকে চার কেজি চিয়া উৎপাদন করা সম্ভব। এর বাজার মূল্য কেজি প্রতি ৪০০ টাকা। সেই হিসাবে কৃষকরা এক বিঘায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা লাভ করতে পারে। পরিচর্যাও করতে হয় খুবই কম।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওবায়দুর রহমান বলেন, মেক্সিকো, গুয়েতেমালা, কানাডা ও কলম্বিয়াসহ কয়েকটি দেশে ওষুধি ফসল হিসেবে চিয়া চাষ করা হয়। দেশে চিয়ার পরিচিতি ও ব্যবহার কম। তবে আমরা ব্যাপকভাবে এই বীজ চাষ করতে চাই। কারণ রংপুরের মাটি এই বীজ চাষে উপযোগী। ব্যাপকভাবে এই বীজ চাষ হলে কৃষক লাভবান হবেন।

আরও পড়ুনঃ  ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে নেই কৃষি বিভাগ

কৃষি কর্মকর্তা ওবায়দুর রহমান আরও বলেন, চিয়া বীজ খেলে মানবদেহের শক্তি ও কর্মক্ষমতা বাড়ে। এ বীজ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করে। সেই সঙ্গে ওজন কমানো, সুগার স্বাভাবিক রাখা, হাড়ের ক্ষয়রোধ করে। এ ছাড়া প্রচুর পরিমাণ ফাইবারসমৃদ্ধ চিয়া পেট পরিষ্কার রাখে ফলে কোলন ক্যানসারের ঝুঁকিও কমায়।

২০১৬ সালে বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কৃষিবিদ ড. মেহেদী মাসুদ কানাডা থেকে চিয়া বীজ দেশে আনেন। তারপর থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকার মাটিতে চিয়া বীজের পরীক্ষামূলক চাষ শুরু হয়।

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন