ঢাকা | বৃহস্পতিবার
২৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৫ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ঢাকায় করমর্দন: শুধুই সৌজন্য নাকি বরফ গলছে দিল্লি–ইসলামাবাদের?

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বছরের শেষ দিনে এক অপ্রত্যাশিত দৃশ্য নজর কেড়েছে। ঢাকায় বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে এসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর প্রকাশ্যে হাত মিলিয়েছেন এক পাকিস্তানি শীর্ষ প্রতিনিধির সঙ্গে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক যেখানে তীব্র উত্তেজনার মধ্য দিয়ে গেছে, সেখানে এই করমর্দন নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ভবনের একটি কক্ষে পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির স্পিকার আয়াজ সাদিকের সঙ্গে এই সৌজন্য বিনিময় করেন জয়শঙ্কর। সেখানে দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক দেশের কূটনীতিক উপস্থিত ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ সচেতন ও পরিকল্পিত।

পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন দল পিএমএল-এনের বর্ষীয়ান নেতা আয়াজ সাদিক এক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে জানান, জয়শঙ্কর নিজেই এগিয়ে এসে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন এবং পরিচয় বিনিময়ের আগেই স্পষ্ট করে দেন যে তিনি সাদিককে চেনেন। তাঁর ভাষায়, জয়শঙ্করের আচরণ ছিল আত্মবিশ্বাসী এবং হাস্যোজ্জ্বল।

এই করমর্দনের ছবি পাকিস্তানের স্পিকারের দপ্তর থেকে প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছবিটি শেয়ার করা হয়। তবে ভারতের সরকারি কোনো প্ল্যাটফর্মে তা প্রকাশ পায়নি, যা বিষয়টিকে আরও কৌতূহলোদ্দীপক করে তুলেছে।

এই দৃশ্যের সঙ্গে গত সেপ্টেম্বরের ঘটনার স্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে। সে সময় এশিয়া কাপ ক্রিকেটে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের পর ভারতীয় ক্রিকেটাররা পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত মেলাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। মাঠের সেই আচরণ তখন দুই দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনারই প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়েছিল।

এর আগেই, গত বছরের এপ্রিলে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে সংঘটিত এক হামলায় ২৬ জন নিরীহ নাগরিক প্রাণ হারান। এই ঘটনার পর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক আরও খারাপ হয়। নয়াদিল্লি ওই হামলার দায় ইসলামাবাদের ওপর চাপিয়ে একাধিক কঠোর পদক্ষেপ নেয়, যার মধ্যে অন্যতম ছিল সিন্ধু নদ পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত করা। প্রায় ছয় দশক ধরে কার্যকর থাকা এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত সিন্ধু অববাহিকার ছয়টি নদীর জল ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছিল।

এরপর গত মে মাসে ভারত ও পাকিস্তান চার দিনের এক ভয়াবহ আকাশযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। উভয় দেশই নিজেদের বিজয়ী দাবি করলেও এটি ছিল গত তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর সামরিক সংঘাত। এই যুদ্ধের প্রভাব কূটনীতি থেকে খেলাধুলা সব ক্ষেত্রেই ছড়িয়ে পড়ে।

ইসলামাবাদ ভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক মোস্তফা হায়দার সাইয়েদ মনে করছেন, ঢাকার এই সাক্ষাৎ বরফশীতল সম্পর্কের মধ্যে সামান্য উষ্ণতার ইঙ্গিত। তাঁর মতে, কর্মকর্তাদের মধ্যে ন্যূনতম সৌজন্য ও সম্মান প্রদর্শনই ভবিষ্যৎ সংলাপের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

তবে ভারতের বিশ্লেষকদের একাংশ বিষয়টিকে অতটা গুরুত্ব দিতে নারাজ। হিন্দুস্তান টাইমসের বৈদেশিক সম্পাদক রেজাউল হাসান লস্করের মতে, একই কক্ষে উপস্থিত হলে সিনিয়র নেতারা সৌজন্য বিনিময় করতেই পারেন এর বেশি কিছু ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

এদিকে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি বাংলাদেশেও নতুন করে প্রভাব বাড়িয়েছে ইসলামাবাদ। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সিন্ধু নদ পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিতের বিষয়টি। পাকিস্তান একে অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখলেও ভারত এখনো অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়নি।

সব মিলিয়ে, ঢাকায় সেই সংক্ষিপ্ত করমর্দন হয়তো কোনো তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক অগ্রগতির বার্তা দেয় না। তবে দীর্ঘদিনের বৈরিতার ইতিহাসে এটি একটি প্রতীকী মুহূর্ত হয়ে থাকছে যা নতুন বছরে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন প্রশ্ন ও সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন