শনিবার, ১৩ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ২৯শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

শুনশান রাজপ্রাসাদ

শুনশান রাজপ্রাসাদ

প্রত্যন্ত গ্রামে রাজপ্রাসাদের আদলে বিশাল বাড়ি। নেই কারো বসবাস। ব্যস্ততার কারণে বাড়ীর মালিক বা পরিবারের কেউ থাকেন না এখানে। ৫০০ কোটির বাড়ী বা টুটুলের বাড়ী নামে পরিচিত কথিত এই রাজপ্রাসাদ এখন শুধুই দর্শনার্থীর খোরাক।

বগুড়া জেলা শহর থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে শিবগঞ্জ উপজেলার নিভৃত গ্রাম দেউলী সরকারপাড়া। সেখানেই রাজপ্রাসাদের আদলে তৈরী করা হয়েছে এই বিশাল বাড়ি। এই গ্রামের মৃত আব্দুল হাইয়ের ছেলে অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের চেয়ারম্যান সাখাওয়াত হোসেন টুটুল বাড়িটি নির্মাণ করেছেন। দেখতে রাজপ্রাসাদ হলেও জনমানবহীন শুনশান এক নিরবতা বাড়ীজুড়ে।

সরোজমিনে জানা যায়, বাড়ীটির মুল নির্মাণ কাজ ২০০৩সালে শুরু হয়ে ২০১৮সালে শেষ হলেও এখনো কিছু সংস্কার চলমান রয়েছে। প্রায় দেড় একর জমির উপর নির্মিত বাড়ীটিতে নির্ণাণ শৈলী ও কারুকাজ বেশ দৃষ্টিনন্দন। অনেকটা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ও মুল ফটকের নকশা নাটোরের উত্তরা গণভবনের মত মনে হয়। বাড়ির ভেতরে হাতের বাঁয়ে চোখে পড়বে শ্বেতপাথরের হংস ফোয়ারার চার ধারে পাথরের শান বাঁধানো পুকুর। দেখা মেলে মার্বেল পাথরে নির্মিত দেয়াল ও মেঝে এবং কক্ষে ঝোলানো মূল্যবান ঝাড়বাতি। প্রথম ইউনিটে বড় দরজা দিয়ে প্রবেশের পর বিরাট হল রুম। এখানে ফাইভ স্টার হোটেলের লাউঞ্জ ও রিসিপশনের মতো ডিজাইন করে রাখা হয়েছে। কাঠের জানালা-দরোজাসহ কাঠে তৈরী প্রতিটি কাজই প্রাচীন নকশায় তৈরি। অতিথিশালার দেয়ালে টেরাকোটায় সাটানো হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং রাজনীতিবিদ ও মনিষিদের ছবি। দুটি অংশে বিভক্ত বাড়িটির একটি মালিকের নিজের থাকার জন্য এবং অন্যটি নির্মাণ করা হয়েছে অতিথিশালা হিসেবে। একটি চারতলা আরেকটি তিনতলা বাড়ির ছাদে রয়েছে চারটি করে গম্বুজ। দুটি বাড়ি ছাড়াও আলাদা করে রয়েছে আকর্ষণীয় ডিজাইনের রান্নাঘর, দুটি পুকুর, বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর ভাস্কর্য নিয়ে তৈরি করা একটি পার্ক ও ফুলের বাগান। তবে এই বাড়ির নির্মান ব্যয় নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। স্থানীয়দের মুখে মুখে শোনা যায়, বাড়িটি নির্মাণ করতে খরচ হয়েছে ৫০০কোটি টাকা, যদিও এর কোনো সত্যতা আজও পায়নি কেউ। অনেকে বলছেন, বাড়িটি নির্মাণে অবশ্যই বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে, তবে এর পরিমান সম্পর্কে সঠিক তথ্য বাড়ির মালিক ছাড়া কেউই জানেন না। সাখাওয়াত হোসেন টুটুল ব্যক্তিগত কোনো মোবাইল ব্যবহার করেন না বলে জানিয়েছেন তার স্বজনরা।

আরও পড়ুনঃ  ঘুরে দাঁড়াচ্ছে রাঙামাটির পর্যটন খাত

জানা যায়, ছাত্রজীবন থেকেই সাখাওয়াত হোসেন টুটুল ঢাকায় বসবাস করতেন। লেখাপড়া শেষ করে বিয়ে করেন এক অবাঙালি নারীকে। এরপর ধীরে ধীরে ঢাকা ও বগুড়ায় বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বর্তমানে ঢাকার অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের মালিক তিনি। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান সাখাওয়াত হোসেন টুটুল হঠাৎ এত সম্পদের মালিক হওয়ায় এলাকায় রয়েছে নানা আলোচনা ও রহস্য। গত বছর পর্যন্ত দুদকের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ২বছর কারাগারে ছিলেন সাখাওয়াত হোসেন টুটুল। জামিনে মুক্ত হওয়ার পর অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের চেয়ারম্যান হিসেবে বর্তমানে ঢাকাতেই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস তার। বাড়িটি দেখাশোনা করছেন টুটুলের ভাই প্রতিনিধি ফজলুল বারী কাটু ও তিনজন কেয়ারটেকার।

স্থানীয় বাসিন্দা সাংবাদিক শফিউল আলম ডিউ বলেন, ‘কয়েকবছরে বাড়ীটি বেশ আলোচনায় এসেছে। যতটুকু জেনেছি, টুটুল সাহেব মুলত সৌখিনতা থেকেই এটি নির্মাণ করেছেন। এরফলে গ্রামের মানুষদের মাঝে বড় হওয়ার স্বপ্ন বুনে দিতে পেরেছেন তিনি।’

প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসে বাড়ীটি একনজর দেখার জন্য। অপরিচিত লোকজনের ভেতরে প্রবেশে অনুমতি না থাকায় অনেকেই বাইরে থেকে একনজর দেখে বা ছবি তুলে ফিরে যান। দুপচাচিয়া থেকে আসা দর্শনার্থী গোলাম রব্বানী জানান, ‘স্যোসাল মিডিয়ায় টুটুলের বাড়ীর ছবি দেখে পরিবার নিয়ে দেখতে এসেছেন। কিন্তু ভেতরে প্রবেশের অনুমতি না পাওয়ায় অনেকটা ক্ষুদ্ধ হয়ে বাড়ী ফিরছেন তিনি।’ তবে পরিচিত ও বিশেষ ব্যক্তিরা আলোচনাসাপেক্ষে প্রবেশের অনুমতি পেয়ে থাকেন।

এদিকে লোকজনের ভিড় হওয়ার কারণে বাড়ির সামনে গড়ে উঠেছে একটি হোটেলসহ কয়েকটি দোকান। বিশেষ দিবসগুলোতে ভ্রাম্যমাণ কিছু দোকানও বসে এখানে। বগুড়ায় কয়েকবছর যাবৎ বেশ আলোচিত এই কথিত রাজপ্রসাদ এলাকার মানুষের মুখে টুটুলের বাড়ী নামে খ্যাত। ধারণা করা হচ্ছে, চাকুরী-ব্যবসা থেকে অবসরের পর বাড়ীর মালিক সাখাওয়াত হোসেন টুটুল বসবাস শুরু করবেন।

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন