ঢাকা | শুক্রবার
৩০শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৬ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ধান-চাল সংগ্রহে ‘ঘুষ’

  • কলাপাড়ায় খাদ্য অধিদপ্তরে নিম্নমানের চাল সংগ্রহ

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় খাদ্য শস্য সংগ্রহ নীতিমালা ২০১৭ এবং চাল সংগ্রহ ও নিয়ন্ত্রণ আদেশ ২০০৮ এর নিয়ম পরিপন্থী উপায়ে ধান, চাল সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচিত কৃষক তালিকায় রয়েছে ঠিকাদার, ব্যবসায়ী ও ধনাঢ্য ব্যক্তির নাম। তালিকাভুক্ত একাধিক কৃষক তালিকায় নাম থাকার তথ্য জানেন না বলে জানিয়েছেন। এতে প্রকৃত কৃষক লাভবান হতে পারেনি, লাভবান হয়েছে অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট একটি মধ্যস্বত্ত্বভোগী চক্র।

এছাড়া মোটা অংকের উৎকোচে কাঁচা-পাকা ধানসহ ট্রলার ডুবির ধান ছাঁটাই করে তৈরি নিম্নমানের চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব চাল গুদাম থেকে সরকারী বরাদ্দের অনুকূলে ইতিমধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে। চুক্তিবদ্ধ চাল কল বন্ধ থাকলেও এর নামে কম মূল্যে নিম্নমানের চাল কিনে সংগ্রহ করছেন গুদাম কর্তৃপক্ষ। এরপর বিল করে মিল মালিকের পরিবর্তে নিজেদের ব্যাংক হিসাবে জমা দিয়ে উত্তোলন করে নিচ্ছেন। এতে উপজেলা ধান, চাল সংগ্রহ কমিটির দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।-তথ্য একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের।

খাদ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, অভ্যন্তরীণ বোরো সংগ্রহ ২০২২ মৌসুমে
কলাপাড়ায় ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৮৬ টন। অনলাইনে আবেদনের পর লটারির মাধ্যমে কৃষিবিভাগ ও অধিদপ্তর ১২৮ কৃষকের তালিকা নির্বাচন করে, যা ৬ সদস্যের সংগ্রহ কমিটির প্রধান ইউএনও’র আইডি থেকে অনুমোদন হয়ে অধিদপ্তরে প্রেরণ করা হয়। প্রতিকেজি ধানের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ২৭ টাকা। এছাড়া অধিদপ্তরের ১৬ মে ১৭৮০(১৩) স্মারকে বিচ অটো রাইস ইন্ডাস্ট্রিজের অনুকূলে ৭৮১ টন এবং ১৮০১ (১৩) স্মারকে মেসার্স খেপুপাড়া অটো রাইস মিলের অনুকূলে ৩৮৬.২২০ মে.টন চালের বরাদ্দ করা হয়। প্রতিকেজি সিদ্ধ চালের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৪০ টাকা।

অধিদপ্তর সূত্র আরও জানায়, ধান সংগ্রহের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শতকরা ১৪ ভাগ আদ্রতা, ০.৫ ভাগ বিজাতীয় পদার্থ, ৮ ভাগ ভিন্ন জাতের ধানের মিশ্রণ, ২ ভাগ অপুষ্ট ও বিনষ্ট দানা এবং শতকরা ০.৫ আগ চিটা এর বিনির্দেশ রয়েছে। এছাড়া সিদ্ধ চাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে শতকরা ১৪ ভাগ আর্দ্রতা, ৬ ভাগ বড় ভাঙ্গা দানা, ২ ভাগ ছোট ভাঙ্গা দানা, ৮ ভাগ ভিন্ন জাতের মিশ্রন, ০.৫ আগ বিনষ্ট দানা, বিবর্ন দানা ০.৫ ভাগ, ধান প্রতি কেজিতে ১টি, বিজাতীয় পদার্থ ০.৩ ভাগ, অর্ধসিদ্ধ দানা শতকরা ১ ভাগ এবং ছাঁটাই উত্তম হওয়ার বিনির্দেশ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ডিজিটাল পদ্ধতিতে তৈরি তালিকার চম্পাপুর ইউনিয়নের কৃষক মিকুন সিমলাই তালিকায় তার নাম থাকার তথ্য জানেন না। তিনি ক্ষেত থেকে স্থানীয় ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করেছেন। বালিয়াতলী ইউনিয়নের গৃহবধূ হেনা তালিকার বিষয়ে কিছুই জানেন না অথচ নির্বাচিত কৃষক তালিকায় তার নাম রয়েছে। ধানখালী ইউনিয়নের শামসুদ্দিন তদ্বির করে কৃষক তালিকায় নাম অন্তর্ভূক্ত করার কথা বলেছেন। ধূলাসার ইউনিয়নের কবির সিকদার চেয়ারম্যানের মাধ্যমে তালিকায় নাম উঠিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, চাল সংগ্রহে প্রতি কেজি ১ নম্বর চাল ১.৫০ টাকা, মধ্যম মানের চাল ২ টাকা এবং নিম্নমানের লাল চাল ৩.৫০ টাকা উৎকোচ নিচ্ছে খাদ্য অধিদপ্তর। চুক্তিবদ্ধ মেসার্স খেপুপাড়া অটো রাইস মিল দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকলেও বরাদ্দকৃত সমুদয় চাল সংগ্রহ দেখানো হয়েছে। যা টিআর, কাবিখা, ভিজিডি, ভিজিএফ, ওএমএমসহ অন্যান্য বরাদ্দের চাল অর্ধেক মূল্যে ক্রয় করে মিলারের অনুকূলে সমন্বয় করা হয়েছে।

জনপ্রতিনিধিরা সরকারি বরাদ্দের কিছু চাল গুদামে বিক্রি করেছেন পরিবহন খরচ বহনে। পরে চুক্তিবদ্ধ চাল কলের নামে বিল করে মিল মালিককে কিছু টাকা দিয়ে সমুদয় টাকা পকেটস্থ করেছেন গুদাম পরিদর্শক ও সহকারী উপ-খাদ্য পরিদর্শক।

এছাড়া মোটা অংকের উৎকোচে চুক্তিবদ্ধ অপর চাল কল বীচ অটো রাইস মিলের কাঁচা-পাকা ধানসহ ট্রলার ডুবির ধান ছাঁটাই করা নিম্নমানের চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। খাদ্য গুদামের উপ-খাদ্য পরিদর্শকের সোনালী ব্যাংক কলাপাড়া বন্দর শাখা এবং মার্কেন্টাইল ব্যাংক, কলাপাড়া শাখা’র ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে উৎকোচের টাকা জমা করা হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এম আর সাইফুল্লাহ বলেন,’অনলাইনে আবেদনের পর অধিদপ্তর ও খাদ্য সংগ্রহ কমিটির সমন্বয়ে তালিকা যাচাই করে কৃষক তালিকা নির্বাচন করা হয়েছে। প্রকৃত কৃষক ছাড়া কারও নাম নেই তালিকায়।’

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নুরুল্লাহ বলেন, ’ডিজিটাল প্রযুক্তিতে এনআইডি
ও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে তালিকা করা হয়েছে। এখানে অনিয়মের সুযোগ নেই।’

সহকারী উপ খাদ্য গুদাম পরিদর্শক মেহেদী হাসান উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ’বিচ অটো’র মালিকের কাছ থেকে ৫ লক্ষ টাকা ধার নিয়েছিলাম, যা পরবর্তীতে পরিশোধ করে দিয়েছি।

খাদ্য গুদাম পরিদর্শক ফারুক হোসেন বিপ্লব বলেন, ’খাদ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী ধান, চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। এখানে দুর্নীতি, অনিয়মের প্রশ্নই আসেনা।’

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক লিয়াকত হোসেন বলেন, ’চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০৫৮ টন, সংগ্রহ হয়েছে ১৪১৩ টন। চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৯১০ টন, সংগ্রহ হয়েছে ৬১০০ টন।’ লিয়াকত হোসেন আরও বলেন, ’কলাপাড়ায় চুক্তিবদ্ধ বীচ অটোর ২০০ টন চা এখনও সংগ্রহ হয়নি, ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সময় আছে। এ ছাড়া কলাপাড়া এলএসডি’র অনিয়ম সংক্রান্ত কোনো তথ্য আমার জানা নেই।’

আনন্দবাজার/শহক

সংবাদটি শেয়ার করুন