বৃহস্পতিবার, ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা আশ্বিন, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বেগম রোকেয়া: নারী জাগরণের পথিকৃত

বেগম রোকেয়া: নারী জাগরণের পথিকৃত

আশিকুর রহমান সৈকত

আজ ৯ ডিসেম্বর। বেগম রোকেয়া দিবস আজ। ভারতীয় উপমহাদেশের নারী জাগরণের পথিকৃত মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়ার জন্ম ও প্রয়াণ দিবস আজ। দিবসটি বাংলাদেশে সরকারিভাবে একটি জাতীয় দিবস হিসেবেও বিবেচিত।

নারী জাগরণের কথা উঠলেই যে মহীয়সী নারীর নাম সবার আগে বাঙালীদের মনে জেগে ওঠে, তিনি বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন । তিনি ছিলেন বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত, গভীরভাবে সমাজ সচেতন ও যুক্তিবাদী। অন্যদিকে সমাজ পরিবর্তনে একনিষ্ঠ সংগঠক।

রংপুরের পায়রাবন্দের খোর্দমুরাদপুর গ্রামে ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন বেগম রোকেয়া। তার পিতা জহীরুদ্দীন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের আরবি, উর্দু, ফারসি, বাংলা, হিন্দি এবং ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। কিন্তু মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে তিনি ছিলেন রক্ষণশীল। রোকেয়া যে সামাজিক পরিমন্ডলে বেড়ে ওঠেন, সেখানে মুসলমান মেয়েদের গৃহের অর্গলমুক্ত হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের কোনো সুযোগ ছিল না। সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেলেও ভাইদের সহায়তায় তিনি বাড়িতে পড়াশোনার সুযোগ লাভ করেন। বড় ভাই-বোনদের সমর্থন ও সহায়তায় তিনি বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাই ভালভাবে আয়ত্ত করেন।

বিয়ের পর তাঁর স্বামীর অনুপ্রেরণায় সাহিত্যচর্চার সূত্রপাত ঘটে। তবে স্বামীর মৃত্যুর পর নিঃসঙ্গ রোকেয়া নারীশিক্ষা বিস্তার ও সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন, গড়ে তোলেন নারীদের জন্য স্বতন্ত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তাঁর অসামান্য কাজের প্রশংসা করেন ব্রিটিশ- ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিশিষ্ট নেত্রী সরোজিনি নাইডু। তিনি বেগম রোকেয়াকে একটি চিঠিতে লেখেন, “কয়েক বছর ধরে দেখছি সে আপনি কি দুঃসাহসের কাজ করে চলছেন। মুসলিম বালিকাদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য আপনি যে কাজ হাতে নিয়েছেন এবং তার সাফল্যের জন্য দীর্ঘকালব্যাপী যে কাজ হাতে নিয়েছেন, তা বাস্তবিকই বিস্ময়কর।”

আরও পড়ুনঃ  বাংলাদেশের আমূল পরিবর্তনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

বেগম রোকেয়ার লেখার ধরণ ছিল একদম স্বকীয়। আর প্রকাশভঙ্গীও ছিল অন্যদের থেকে আলাদা। যার ফলে সহজেই তাঁকে সমসাময়িক নারীদের সাহিত্যকর্মের তুলনায় এগিয়ে রাখা যায়। এই নিয়ে বিশিষ্ট সাহিত্যিক কাজি আবদুল ওদুদ বলেছিলেন, “বাস্তবিকই মিসেস আর‍, এস, হোসেন একজন সত্যিকার সাহিত্যিক, তাঁর একটি বিশিষ্ট স্টাইল আছে। সেই স্টাইলের ভিতর দিয়ে ফুটেছে তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর কান্ডজ্ঞান আর বেদনাভরা অথবা মুক্তি অভিসারী মন।”

তিনি সবসময় সাম্যের ডাক দিয়ে গেছেন। তিনি পুরুষতান্ত্রিক কিংবা নারীতান্ত্রিক সমাজ গড়তে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন সমাজে নারী ও পুরুষ যাতে একসাথে সমান মর্যাদা এবং অধিকার নিয়ে বাঁচে। উনিশ শতকের দিকে যখন মেয়েরা ছিল অবরোধবাসিনী, তখন তিনিই সেই ঝিমিয়ে পড়া নারী জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিলেন, নারীর পরাধীনতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। তিনি সবসময়ই বলতেন, “মেয়েদের এমন শিক্ষায় শিক্ষিত করিয়া তুলিতে হইবে, যাহাতে তাহারা ভবিষ্যৎ জীবনে আদর্শ গৃহিণী, আদর্শ জননী এবং আদর্শ নারীরূপে পরিচিত হইতে পারে। “

তিনি কখনোই পুরুষকে ছোট করে দেখেননি। তাই তো তিনি লিখেছিলেন, “আমরা সমাজের অর্ধাঙ্গ, আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কীরূপ? কোনো ব্যক্তি এক পা বাঁধিয়া রাখিলে সে খোঁড়াইয়া খোঁড়াইয়া কতদূর চলিবে? পুরুষের স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে। তাহাদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যাহা আমাদের লক্ষ্য তাহাই।”

তিনি আরো বলেন, “দেহের দু’টি চক্ষুস্বরূপ, মানুষের সবরকমের কাজকর্মের প্রয়োজনে দু’টি চক্ষুর গুরুত্ব সমান।”

তিনি নারী ও পুরুষকে একটি গাড়ির দু’টি চাকার সাথে তুলনা করেছেন। কেননা একটি চাকা ছাড়া পুরো গাড়িটাই অচল। তাই নারী ও পুরুষ যদি মিলেমিশে কাজ করে, তাহলে সমাজে পরিবর্তন আসবেই। সমাজের অর্ধেক অংশকে বাদ দিলে কখনোই রাষ্ট্রের উন্নতি হবে না। তাই তো তিনি ছিলেন সমতায় বিশ্বাসী।

আরও পড়ুনঃ  বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শন: একটি দার্শনিক পর্যালোচনা

যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত বেগম রোকেয়া সম্পর্কে তাঁর ‘বঙ্গের মহিলা কবি’ গ্রন্থে লিখেছেন, “বঙ্গের মহিলা কবিদের মধ্যে মিসেস আর, এস, হোসায়েনের নাম স্মরণীয়। বাঙ্গালাদেশের মুসলমান- নারী প্রগতির ইতিহাস- লেখক এই নামটিকে কখনো ভুলিতে পারিবেন না। রোকেয়ার জ্ঞানপিপাসা ছিল অসীম। গভীর রাত্রিতে সকলে ঘুমাইলে চুপি চুপি বিছানা ছাড়িয়া বালিকা মোমবাতির আলোকে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার কাছে ইংরাজী ও বাংলায় পাঠ গ্রহণ করিতেন। পদে পদে গঞ্জনা সহিয়াও এভাবে দিনের পর দিন তাঁহার শিক্ষার দ্রুত উন্নতি হইতে লাগিল। কতখানি আগ্রহ ও একাগ্রতা থাকিলে মানুষ শিক্ষার জন্য এরূপ কঠোর সাধনা করিতে পারে তাহা ভাবিবার বিষয়।”

নারী জাগরণের অগ্রদূত এবং আলোর দিশারী বেগম রোকেয়ার জীবনকাল ছিল মাত্র বায়ান্ন বছর। ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়।

মহিয়সী বাঙালি নারী হিসেবে বেগম রোকেয়ার অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে রংপুর বিভাগের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় নামকরণ করেন । এটিই বাংলাদেশের প্রথম নারীর নামে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।

২০০৮ সালের ৮ অক্টোবর রংপুর বিভাগের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে রংপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। যা ২০০৯ সালে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নামকরণ করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের জন্য আবাসিক হল বেগম রোকেয়ার নামে নির্মাণ করে। বাংলাদেশ সরকার বেগম রোকেয়া স্মরণে গণউন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে স্থাপন করা হয় বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র। যা বাংলাদেশ সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।

আরও পড়ুনঃ  প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পিঠাতেই জীবন পার

নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রতি বছর রোকেয়া পদক দেয় বাংলাদেশ সরকার।

বেগম রোকেয়ার প্রচেষ্টায় আজ বাঙালি নারীরা স্বাধীনতার স্বাদ পাচ্ছেন। নিজের পছন্দ আর অধিকার আদায়ের কণ্ঠ সোচ্চার করতে পারছেন। নিজেদের মেধা যাচাইয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। শুধু ঘরেই নয়, পুরুষের পাশাপাশি নারীরা কাজ করছেন ঘরের বাইরেও।

লেখক:
মোঃ আশিকুর রহমান (সৈকত)

শিক্ষার্থী 
লোকপ্রশাসন ও সরকার পরিচালনা বিদ্যা বিভাগ,
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

সংবাদটি শেয়ার করুন