ঢাকা | সোমবার
২রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৯শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

প্রতিঘরে বাস সাতজনের

রংপুর নগরীর নিউ জুম্মাপাড়া এলাকার হরিজন পল্লী

  • নলকূপ একটি, বাথরুমে দীর্ঘলাইন
  • পল্লীর ১০৫ ঘরে ৭ শতাধিকের বসবাস
  • জরাজীর্ণ ঘরে গাদাগাদি বসবাস
  • ৮০ বিঘার মধ্যে আয়ত্বে পৌনে দুই বিঘা
হরিজন পল্লীতে বর্তমানে সাতজন ছেলে-মেয়ে স্কুলে যায়। এ পর্যন্ত এসএসসি পাস করেছে একজন। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে ৬ থেকে ৭ জন। লেখাপড়ার সামর্থ্য না থাকায় বাবা-মাকে সাহায্য করছে ছেলে-মেয়েরা

রংপুর নগরীর নিউ জুম্মাপাড়া এলাকায় হরিজন পল্লীতে দলিত সম্প্রদায়ের লোকজন দুঃখকে নিত্যসঙ্গি করে বাস করছে কয়েক যুগ ধরে। পল্লীর প্রতিটি পরিবারে ৬ থেকে ৮ জন সদস্য ছোট্ট একটি ঘরে অমানবিকভাবে গাদাগাদি করে বাস করছেন। সেই ঘরও আবার জরাজীর্ণ। কারও মা-বাবা হয়তো চৌকিতে, কেউ মাটিতে আবার কেউবা ওই ঘরের বারান্দাতেই রাত যাপন করেন। ওই পল্লীতে প্রায় ১০৫টি ঘরে ৭ শতাধিক হরিজন সম্প্রদায়ের লোক বসবাস করছেন। এখানকার হরিজনদের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি তাদের জমি দখল করে চারশতাধিক স্থানীয় পরিবার বাস করছেন। অথচ জায়গার অভাবে তারাই আজ সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন।

যুগের পর যুগ ধরে এমন অবস্থা চলে আসলেও রংপুর নগরীর এ হরিজন পল্লী সংস্কারে সংশ্লিষ্ট কারও মাথা ব্যথা নেই। ৭ শতাধিক মানুষের ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ রয়েছে একটিমাত্র নলকূপ। সেটিও প্রায় এক বছর থেকে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। এছাড়া তাদের ব্যবহার উপযোগি বাথরুম রয়েছে মাত্র দুটি। প্রাকৃতিক কাজ সারতে সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনায় পড়ছেন মহিলারা। ঝড় বৃষ্টি এলে পল্লীতে হাটু পানি জমে থাকে, বাথরুমে যেতে হয় লাইন ধরে।

স্থানীয়রা জানায়, দেশ স্বাধীনের পর তৎকালিন রংপুর পৌর চেয়ারম্যান মাহতাব খান এ পল্লী স্থাপনের উদ্যোগ নেন। পরবর্তী চেয়ারম্যান ভাষা সৈনিক মোহাম্মদ আফজাল হরিজনদের জীবনমান উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। টিনসেড পাকাঘর নির্মাণ করে হরিজনদের এ পল্লী গড়ে তোলা হয়। প্রায় চার দশক আগে তৈরি এসব ঘরের অনেকস্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। বাড়ি ধসে যে কোন সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা।

হরিজন পল্লীতে বসবাসরত শ্রি মন্ডলের ছেলে কমল জানান, বাবা-মা, স্ত্রী ও দুই ছেলেসহ তারা সবাই এক ঘরে থাকেন। কেউ বারান্দায় কেউ মেঝেতে রাত পার করেন। পল্লীর সর্দার জীবনের মা দুলালী বেগম জানান, একটি ঘরে ৮ জন গাদাগাদি করে থাকেন। তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে বাথরুম এবং পানি। পল্লীর আশপাশ থেকে পানি এনে তাদের জীবন ধারণ করতে হচ্ছে।

জীবনের বাবা ভোলা জানান, হরিজনদের ৮০ বিঘা জায়গার মধ্যে মাত্র পৌনে ২ বিঘা জমিতে তারা বাস করেন। বাকি জমি দখল করে আছেন স্থানীয়রা। তাদের দুঃখ-দুর্দশা কোন জনপ্রতিনিধিই নজরে আনছেন না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। ওই পল্লীতে স্কুলে যাওয়ার উপযুক্ত শতাধিক ছেলে-মেয়ে থাকলেও অভাবের সংসারে বাবা-মায়ের কাজে সাহায্য করতে গিয়ে তাদের আর স্কুলে যাওয়া হয়না। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে মাত্র সাতজন স্কুলে যাওয়া-আসা করে। হরিজন পল্লীর ছেলে-মেয়েদের মধ্যে এসএসসি পাশ করেছে মাত্র একজন। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে ৬ থেকে ৭ জন। লাবনি (১৫) ও লক্ষ্মণ (১৭) জানায়, লেখাপড়া করার মত সামর্থ্য না থাকায় তারা স্কুলে না গিয়ে কাজ করে বাবা-মাকে সাহায্য করছে।

অন্যদিকে হরিজনদের জমিতে ঘর তুলে বসবাস করছেন বলে স্বীকার করেন হায়দার আলি। তিনি বলেন, ‘আমরা নদীভাঙা ভূমিহীন মানুষ। অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গাও নাই। দীর্ঘদিন থেকে তাই এখানে বসবাস করছি।’ একই ধরনের কথা বলেন, সেখানে হরিজনদের জায়গায় থাকা লাবনি বেগম। তিনি বলেন, আমরা ভূমিহীন। বাবার আমল থেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে বাস করছি।

সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সেকেন্দার আলী বলেন, হরিজন পল্লীর মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সিটি করপোরেশন কাজ করছে। তবে সেখানে অবৈধ দখলদার আছে। সু-শাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের রংপুর জেলা সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন বলেন, ওখানে শত শত পরিবার অবৈধভাবে জায়গা দখল করে বসবাস করছেন। কয়েক যুগ আগে হরিজনদের জন্য নির্মিত ঘরগুলোও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদসহ পরিকল্পিভাবে হরিজনদের বাসস্থান গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

আনন্দবাজার/শহক

সংবাদটি শেয়ার করুন