ঢাকা | সোমবার
২রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৯শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পথে পর্যটন

  • বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ হবে সুইজারল্যান্ড, কক্সবাজার হবে এশিয়ার ভিয়েনা
  • পর্যটনশিল্পের অপার সম্ভাবনা কাজে লাগালে বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার রোল মডেল

একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন সুইজারল্যান্ডের আদলে। আর পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে করে তুলতে চেয়েছিলেন এশিয়ার ভিয়েনা হিসেবে। তার সেই স্বপ্নের পথেই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। রাজনৈতিক কারণে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা, উপজেলা, থানা ঘুরেছেন বঙ্গবন্ধু। তিনি এ দেশের অপার সম্ভাবনা দেখে মুগ্ধ হয়েছেন বারবার। তাই ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা লাভের পর পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি অনুধাবন করেছিলেন এ দেশের উন্নয়নের জন্য অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে পর্যটন শিল্প।

পর্যটন শিল্পের বিকাশে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বঙ্গবন্ধু এর সঠিক ব্যবস্থাপনার দিকে জোর দেন। তাই পর্যটনকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম উৎসে পরিণত করতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল এ দেশের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে প্রধান ভূমিকা পালন করা। সেই থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল তিনি সুইজারল্যান্ডের মতো করে বাংলাদেশকে নির্মাণ করবেন আর বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন স্থান কক্সবাজারকে নিয়ে ছিল আরো বড় স্বপ্ন। তিনি কক্সবাজারকে এশিয়ার ভিয়েনা হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। সেই লক্ষ্যেই কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ঝাউবনের গোড়াপত্তন করেছিলেন। এছাড়া সমুদ্রের অমিত সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে উত্তরণে ১৯৭৪ সালে সমুদ্রসীমা আইন প্রণয়ন করছিলেন।

১৯৭২ সালের নভেম্বরে বঙ্গবন্ধু কুয়াকাটা ভ্রমণ করেন। তখন তিনি এর সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হন। কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে তৈরির জন্য নানামুখী পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। তবে তা তিনি বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এ দেশে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এটির প্রসার ঘটাতে পারলে দেশের অর্থনৈতিক ভাবমূর্তি পাল্টে যাবে।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশ পুর্নগঠনের সময়ে পর্যটন নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। অর্থনীতির উন্নয়ন, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক নিরাপত্তাসহ সব ক্ষেত্রে উন্নয়নের কাজ শুরু হয়। দেশের অন্যান্য সম্ভাবনাময় সেক্টরের মতো পর্যটন শিল্প নিয়েও বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনা ছিল সুদূরপ্রসারী। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর এসে পর্যটন খাত দেশে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করে সমৃদ্ধ হচ্ছে অর্থনীতি। পর্যটনকে শিল্প হিসেবে চিহ্নিত করায় বাংলাদেশে এ শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ৪ জনের মধ্যে একজনের কর্মসংস্থান হচ্ছে পর্যটনশিল্পে। দেশের জাতীয় আয়ের ৪.৪ ভাগ আয় আসছে পর্যটন খাত থেকে। ১৯৯৫ সালে অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা ছিল ৫ লাখ। ২০১১-২০১২ অর্থবছরে দেশে পর্যটকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ লাখে। ২০১৯ সালে আরো বেড়ে দাঁড়ায় এক কোটিতে। এ সময় জাতীয় আয়ে পর্যটন খাতের অবদান ছিল ৯৫০ দশমিক ৭ বিলিয়ন টাকা যা জিডিপির ৪ দশমিক ৩০ শতাংশ। অদূর ভবিষ্যতে তা ৬ শতাংশে পরিণত হবে আশা করা হচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ সারাবিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল কয়েকটি পর্যটন মার্কেটের মধ্যে অন্যতম। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের এক গবেষণা অনুযায়ী ২০১৪ সালে পর্যটন খাতে ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা দেশের মোট কর্মসংস্থানের ১ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে ২ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে। সে হিসাবে ২০২৪ সালে মোট কর্মসংস্থানের মধ্যে পর্যটন খাতের অবদান দাঁড়াবে ১ দশমিক ৯ শতাংশ।

পর্যটনশিল্পের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সেক্টরে যেমন- পরিবহন, হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ, রিসোর্ট, এয়ারলাইনস ও অন্যান্য যোগাযোগের মাধ্যম থেকে প্রতিবছর প্রচুর রাজস্ব আয় হয়। যা অন্য যেকোনো বড় শিল্প থেকে পাওয়া আয়ের চেয়ে বেশি। ইতোমধ্যে পর্যটনকে বিশ্বের বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর এক-তৃতীয়াংশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস পর্যটনশিল্প। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী, সারা বিশ্বে ১০০ মিলিয়নের বেশি মানুষ তাদের জীবন-জীবিকার জন্য এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল।

পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশে। এখন প্রতিবছর প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ লাখ পর্যটক দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ভ্রমণ করে থাকেন। জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের ফলে সাধারণ মানুষের কাছে ভ্রমণপিপাসা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে বিধায় আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে অনন্য অবদান রাখছে। বাংলাদেশে পর্যটন খাতে সরাসরি কর্মরত আছেন প্রায় ১৫ লাখ মানুষ। এ ছাড়া পরোক্ষভাবে ২৩ লাখ। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা।

বর্তমানে বাংলাদেশের পর্যটন খাতে আয় প্রায় ৭৬ দশমিক ১৯ মিলিয়ন ডলার। ভারত আয় করেছে ১০ হাজার ৭২৯ মিলিয়ন ডলার, মালদ্বীপ ৬০২ মিলিয়ন ডলার, শ্রীলঙ্কায় ৩৮৫ মিলিয়ন ডলার এবং নেপালে ১৯৮ মিলিয়ন ডলার, যা সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশের তুলনায় অপ্রতুল। এদিকে প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০৩০ সালে বিশ্বের ২৯তম এবং ২০৫০ সালে ২৩তম অর্থনীতির দেশে উন্নীত হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে পর্যটন শিল্পকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। দরকার প্রত্যাশিত অবকাঠামো উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক প্রচার-প্রচারণা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত বিনোদন বিকাশের সুযোগ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পর্যটন এলাকায় হোটেল বৃদ্ধি এবং পর্যটন ক্ষেত্রে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা।

বিশ্ব পর্যটন সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের ৫১টি দেশের পর্যটকেরা বাংলাদেশে ভ্রমণ করবেন, যা মোট জিডিপির ১০ শতাংশ অবদান রাখবে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৪ সালে মোট কর্মসংস্থানের ১ দশমিক ৯ শতাংশ হবে পর্যটনশিল্পের অবদান। পর্যটনশিল্পের অপার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার রোল মডেল।

আনন্দবাজার/শহক

সংবাদটি শেয়ার করুন