শনিবার, ১৩ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ২৯শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

আধুনিকতার ছোঁয়ায় করাতিদের পেশা এখন ‘স’ মিলের দখলে

আধুনিকতার ছোঁয়ায় করাতিদের পেশা এখন ‘স’ মিলের দখলে

গাছের শক্ত মোটা ডাল আর পাটের রশি দিয়ে তৈরী করা হতো একটি কাঠমো। আর তার উপরেই রাখা হতো একটি বড় আকারের গাছ। গাছের উপরের অংশে অবস্থান করতেন একজন আর নীচে অবস্থান করতেন দুইজন। এদিকে তিনজন মিলে হাতলযুক্ত করাত দিয়ে উপর-নীচে টেনে ছন্দে-ছন্দে চিরানো হতো প্রকান্ড গাছ। করাত এবং কাঠের ঘর্ষণের ফলে নীচে ঝরে পড়ছে কাঠের গুড়ো। যা এখন শুধুই স্মৃতি। শিল্প-বিপ্লব তথা আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রাম-গঞ্জের হাত করাতিদের পেশা এখন যান্ত্রিক ‘স’মিলের দখলে।

সাধারণত বড় বড় গাছের ছায়ার নীচে তৈরী করা হতো হাত করাত দিয়ে কাঠ চিরানোর কাঠামোটি। আর গাছের ছায়ার নীচে করাতিরা কাজটি করতেন। একপর্যায়ে তাদের শরীর বেয়ে ঘাম নীচে গড়িয়ে পড়তো। কাঠ চিরানোর সময় করাতের অবস্থান ও গতি ঠিক রাখতে কিছুক্ষণ পরপর দেয়া হতো সাময়িক বিরতি।

হাতলযুক্ত করাত দিয়ে গাছ কাটা ও কাঠ চিরানোর সেই দৃশ্য এখন আর চোঁখে পড়েনা। আধুনিক করাতকল তথা ‘স’ মিল কেড়ে নিয়েছে গ্রাম-বাংলার করাতি সম্প্রদায়ের এই পেশাটি। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই পেশাটি অপরিচিত হলেও একসময় কাঠ চিরানোর জন্য এই করাতি’র কাজ করা লোকদের ওপরই নির্ভর করতে হতো মানুষকে। একসময় গ্রাম-বাংলার প্রায় সকল জায়গাতেই প্রতিনিয়ত এই দৃশ্য চোঁখে পড়তো।

আজ থেকে প্রায় ২০-২৫ বছর আগে যান্ত্রিক ‘স’ মিলের তেমন একটা দেখা মিলতো না। বড় বড় গাছ কিংবা কাঠ কাটার জন্য নির্ভর করতে হতো করাতি সম্প্রদায়ের লোকজনের ওপর। বর্তমানে প্রায় বিলুপ্ত হওয়া এই পেশার লোকদের প্রতিটা অঞ্চলে দেখা মিলতো। এমনকি গ্রাম-গঞ্জে ফেরি করে গাছ ও কাঠ কাটার কাজ করতেন করাতিরা।

আরও পড়ুনঃ  রাস্তায় মাটিভরাট নিয়ে ইউপি সদস্যকে মারপিট

অনেক সময়ই গাছ কাটা ও চিরানোর সময় গাওয়া হতো বিভিন্ন সুরের গান। গানের তালে তালে চলতো গাছ কাটা ও চিরানোর কাজ। আর চারপাশে ভীড় জমাতো ছেলে বুড়ো সবাই। তারা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করতেন এই দৃশ্য। করাতি পেশার লোকদের এখন আর তেমন চোঁখে পড়েনা। আধুনিকতার যাতাকলে আর যান্ত্রিক ‘স’মিলের কারণে এবং জীবন-জীবিকার তাগিদে তারা অনেকেই পেশা বদল করেছেন। তাই আগের মতো তেমন আর চোঁখে পড়েনা করাতিদের গাছ কাটা ও চিরানোর দৃশ্য। বর্তমানে আধুনিকতার উৎকর্ষের দাপটের কাছে হারিয়ে গেছে গ্রাম-বাংলার এক সময়ের এই করাতি পেশা। গ্রাম-গঞ্জে এখন পুরোপুরি যান্ত্রিক ‘স’মিলের ঢেউ লেগেছে। কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে করাতের ছন্দময় শব্দ। বিভিন্ন হাট-বাজারে, মেইন রোডের পাশে গড়ে ওঠা অগনিত করাতকল কম খরচে অল্প সময়ের মধ্যেই চাহিদা মাফিক কাঠ চিরানো হচ্ছে।

এক সময় গাজীপুর জেলার প্রায় গ্রামেই করাতি সম্প্রদায়ের লোকজনের বসবাস ছিলো। মাঝে মাঝে শুকনো মৌসুমে পাশ্ববর্তী জেলা কিশোরগঞ্জ ও ময়মনসিংহ থেকে করাতিরা এসে ফেরি করে কাঠ চিরানোর কাজ করতেন। ছয়মাস সময় নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে সকল কাজ সম্পন্ন করে আবার তারা নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যেতেন তারা।

এদিকে গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার বাওরাইদ গ্রামের এমনই একজন করাতি সিরাজ মিয়া। সত্তর (৭০) এর দশকে করাতির কাজ শুরু করেছিলেন সিরাজ মিয়া। বর্তমানে তার বয়স ৮০ বছর। প্রায় ৫০ বছর ধরে তিনি এই করাতি পেশায় কাজ করেছেন। তার সাথে সহযোগি হিসেবে কাজ করেছেন আরো দুইজন। তারাও প্রায় সত্তর বছরের কাছাকাছি।

আরও পড়ুনঃ  ঝিনাইদহে বৃদ্ধার ঘর নির্মাণ করে দিলেন র‌্যাব

সিরাজ মিয়ার সাথে আলাপকালে তিনি দৈনিক আনন্দবাজারকে জানান, আমরা যখন হাত করাত দিয়ে গাছ ও কাঠ কাটার কাজ করতাম, তখন মাঝারী সাইজের একটি কাঠ চিরতে তিনজনের সময় লাগতো অন্তত দুইদিন। মজুরী হিসেবে পেতাম ২৫০০-৩০০০ টাকা। আর এখন আমাদের কাছে আসেই না,বরং ‘স’মিলে নিয়ে যায় এবং অল্প টাকায়, অল্প সময়ে কাঠ চিরানো শেষ করে বাড়ি নিয়ে আসে। তাই আমরা করাতি পেশা ছেড়ে দিয়েছি। আধুনিকতার ছোঁয়ায় গড়ে ওঠা যান্ত্রিক ‘স’মিল আমাদের এই করাতি পেশাকে দখলে নিয়েছে।

আনন্দবাজার/শাহী/সবুজ

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন