শুক্রবার, ১২ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ২৮শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বিলুপ্তির পথে জাতীয় ফুল শাপলা

দূষণ মুক্ত পানির অভাবে গাজীপুর জেলার বিভিন্ন গ্রাম-বাংলার বিল ও ঝিলে দৃষ্টিনন্দন শাপলা ফুলের উৎপাদন ব্যাহত এবং বিলুপ্তির পথে। শাপলার জন্য বিখ্যাত গাজীপুরে এখন আর এই দৃষ্টিনন্দন লাল,নীল,সাদা ও গোলাপী রঙের এই ফুলটির দেখা তেমন মিলে না।

এদিকে জেলার অসংখ্য নদ-নদী,খাল-বিল-ঝিল, পুকুর এবং বিভিন্ন জলাশয় হ্রাস পাওয়া এবং ভূমি খেকুদের দখলে চলে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে পানির শূন্যতা। আর সবচেয়ে বড় কারণ হলো কল-কারখানার দূষিত বর্জ্যে পানি দূষণ হয়ে বিভিন্ন নদ-নদী ও খাল-বিলের পানিতে মিশে পানি ব্যাপকহারে দূষিত হওয়া এবং সেই সাথে জমিতে রাসায়নিক স্যার ও কীটনাশকের বিক্রিয়ার ফলে ব্যাপকভাবে কমে যাচ্ছে শাপলা ফুলের উৎপাদন।

বাংলা নাম শাপলা ফুল, ইংরেজী নাম লিলি, মণিপুরী ভাষায় থরো, আংগৌরা, আর সংস্কৃত ভাষায় কুমুডা, আসাম ভাষায় শাপলা ফুলকে নাল বলা হয়ে থাকে। শুধুমাএ বাংলাদেশেই নয় ভারত মহাসাগরের দ্বীপ রাষ্ট্র শ্রীলংকায়ও জাতীয় ফুল এই শাপলা । তবে বাংলাদেশের মতো তারা শাপলাকে শাপলা বলে না, তারা বলে নীল-মাহানেল।

গাজীপুর জেলার বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জের বিলে-ঝিলে এবং পুকুর ডোবাতে এক সময়ে অনেক শাপলা দেখা যেত। এখন আর তেমনটা চোঁখে পড়েনা। গাজীপুরে কল-কারখানার পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় নদী-নালা,খাল-বিলে ও পুকুর-ডোবা এবং বিভিন্ন জলাশয় ভূমি খেকুদের দখলে চলে যাওয়ায় ক্রমশ হ্রাস পাওয়া এবং কৃষি জমিতে অধিক পরিমাণে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগের ফলে ক্রমশই বিলীন হয়ে যাওয়ার পথে জাতীয় ফুল শাপলা।

গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া,শ্রীপুর,কালীগঞ্জ, কালিয়াকৈর,গাজীপুর সদর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় কিছু লাল শাপলা দেখা গেলেও সাদা,নীল,বেগুনী শাপলা প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। এখনো দূর-দূরান্ত হতে আসা বিভিন্ন পর্যটকেরা কাপাসিয়া উপজেলার ঘাগটিয়া ইউনিয়নের সালদৈ আশুলিয়া ব্রীজ, শ্রীপুর, কালীগঞ্জ ও গাজীপুর সদরের বিশাল অংশ জুড়েই অবস্থান করা বেলাই বিলসহ জেলার বিভিন্ন নদ-নদীতে ও বিলে শাপলা দেখতে ভীড় জমায়। এদিকে বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন এলাকার খাল-বিল, জলাশয় ও নিচু জায়গায় পানি জমে থাকলে সেখানে প্রাকৃতিক ভাবেই জন্ম নেয় জাতীয় ফুল শাপলা।

আরও পড়ুনঃ  আন্তর্জাতিক আইপিএম পুরস্কার পেলেন বারি’র বিজ্ঞানী ড. শাহাদাৎ

কিছুদিন আগেও কাপাসিয়া উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে শাপলা ফুল দেখা যেত। তখন পুকুর,ডোবা, খাল-বিল ও জলাশয় গুলোতে লাল,সাদা,বেগুনী ও বিরল হলুদ প্রজাতির শাপলা ফোটার কারণে চারিদিকে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্যে পরিণত হতো। কিন্তু কালের বির্বতনে এই নয়নাভীরাম দৃশ্য যেন গ্রাম-বাংলা থেকে একেবারেই বিলীন হয়ে যেতে বসেছে।

গাজীপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে লাল রঙের শাপলা দেখা গেলেও দেখা যাচ্ছে না সাদা, গোলাপী,বেগুনী,নীল ও হলুদ শাপলা। এদিকে এসকল শাপলা প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাওয়ার পেছনে বিভিন্ন রকম কারণ রয়েছে বলে মনে করেন গাজীপুরের সচেতন মহল। কারো কারো মতে, ব্রহ্মপুএ,শীতলক্ষ্যা,তুরাগ,বালু নদীর নাব্যতা হ্রাস এবং কিছু কিছু নদী শুকিয়ে যাওয়া, নদী ভরাট করে কৃষি জমি তৈরি, ঘর-বাড়ি তৈরী, ফসলি জমিতে অধিক পরিমাণে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তণের কারণে গাজীপুর জেলার গ্রাম-বাংলা থেকে নান্দনিক সৌন্দর্যমন্ডিত ফুল শাপলা বিলীন হতে চলেছে।
এক সময়ে গাজীপুরের বিলে ঝিলে,পুকুরে বর্ষা মৌসুমে নানা রঙের শাপলার বাহারী রুপ মানুষের নয়ন জুড়িয়ে যেত। কিন্তু এখন আস্তে আস্তে সেই নয়নাভিরাম দৃশ্য হারিয়ে যেতে বসেছে।

এদিকে শাপলা ফুল ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের কাছে ভীষণ পছন্দের। শাপলার ঢ্যাপ বাচ্চাদের প্রিয় খাদ্য এবং গ্রাম-গঞ্জের লোকেরা ঢ্যাপ দিয়ে খই ভেজে মোয়াসহ বিভিন্ন প্রকার সুস্বাদু খাবার তৈরী করতো। আস্তে আস্তে তাও বিলীন হতে যাচ্ছে। অপরদিকে এই শাপলা সবজি হিসেবেও মানুষের কাছে অধিক জনপ্রিয়। অনেকে আবার শাপলা বিল-ঝিল থেকে তুলে এনে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতো। বিশেষ করে লাল শাপলার অনেক রকমের ওষধী গুন রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  সাংবাদিকদের সহায়তার নির্দেশ

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ মাহবুব আলম দৈনিক আনন্দবাজারকে জানান, বিশেষ করে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শাপলা সংগ্রহ করা এবং মাটি থেকে শাপলার কন্দ (শালুক) তুলে ফেলা, শিল্প-কারখানার দূষিত বর্জ্য পানির সাথে মিশে গিয়ে বিভিন্ন নদ-নদী, খাল-বিল,ডোবা ও জলাশয়ের পানিকে দূষিত করে যার ফলে জাতীয় ফুল শাপলাসহ অন্যান্য জলজ উদ্ভিদগুলোর বংশ বিস্তারের ব্যাঘাত ঘটে।

তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশে সাধারণত নিম্ম আয়ের মানুষেরা জীবিকা নির্বাহের জন্য বিভিন্ন নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয় থেকে শাপলা তুলে বাজারে বিক্রি করে। যখন ওই মানুষেরা শাপলা সংগ্রহ করে তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শাপলার শালুকসহ (কন্দ) তুলে ফেলে। তাই শাপলা বিলুপÍ হওয়ার পিছনে এটাও হতে পারে একটি কারণ।

আনন্দবাজার/শহক

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন