বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারণায় এক সময়ের বহুল আলোচিত ‘ভারত ইস্যু’ এবার কার্যত অনুপস্থিত। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতের মতো দলগুলো এই স্পর্শকাতর বিষয়ে এক ধরনের রহস্যময় নীরবতা পালন করছে। যেখানে বিগত নির্বাচনগুলোতে ভারতবিরোধী বক্তব্য নির্বাচনি মাঠ গরম করত, সেখানে এবার দলগুলোর মুখে প্রতিবেশী রাষ্ট্র নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য নেই। এমনকি তারেক রহমান এক জনসভায় ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়—সবার আগে বাংলাদেশ’ বলে জাতীয়তাবাদী স্লোগান দিলেও ভারতের নাম সরাসরি নিয়ে কোনো নেতিবাচক অবস্থান প্রকাশ করেননি।
বিগত দিনগুলোতে দিল্লির পক্ষ থেকে বিভিন্ন অপতৎপরতা এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠলেও বিএনপি ও জামায়াত নেতারা এ বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্ট জানিয়েছেন, নির্বাচনের আগে তারা ভারত নিয়ে কথা বলতে চান না। অন্যদিকে, জামায়াত নেতা এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ভারতের সঙ্গে সমান মর্যাদা ও সুসম্পর্কের নীতির কথা বললেও কোনো কড়া বার্তা দেননি। রাজনৈতিক দলগুলোর এই কৌশলগত নীরবতাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে অভিহিত করেছেন, কারণ দিল্লির নানা উসকানিমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে না তুললে ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকারকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারতের বিভিন্ন থিংকট্যাংক ও সংবাদমাধ্যমগুলোর অবস্থানও বেশ কৌতূহল উদ্দীপক। তারা মনে করছেন, বিএনপি-জামায়াতের এই নীরবতা দিল্লির জন্য স্বস্তিদায়ক। ভারতীয় সাংবাদিক নীতিন গোখলে বা অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের মতো বিশ্লেষকরা লক্ষ্য করেছেন যে, ৫ আগস্ট পরবর্তী প্রবল ভারতবিরোধিতা এখন নির্বাচনি প্রচারণায় দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে জামায়াত এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নমনীয় ও উন্নয়নমুখী অবস্থান নিয়েছে এবং পাকিস্তান জামায়াতের প্রভাবমুক্ত থাকার দাবি করছে। এটি দিল্লির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এই নীরবতার পেছনে ক্ষমতা যাওয়ার সমীকরণ দেখছেন। অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী এবং অধ্যাপক শাহাব এনাম খানের মতে, প্রধান দলগুলো ভারতকে অখুশি করে নির্বাচনি ঝুঁকি নিতে চাইছে না। তারা মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভারতের সঙ্গে যেভাবে দৃঢ়ভাবে ডিল করেছেন, নতুন সরকারের জন্য সেই ধারা বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। কারণ, তরুণ প্রজন্ম কোনোভাবেই ভারতীয় আধিপত্যবাদ মেনে নেবে না। ফলে নির্বাচনের পর ভারতকে সমমর্যাদার ভিত্তিতে ডিল করা এবং অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য গড়ে তোলা ছাড়া নতুন সরকারের সামনে কোনো বিকল্প থাকবে না।




