জুলাই বিপ্লব চলাকালে রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় শাহরিয়ার খান আনাসসহ ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার চার আসামিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এ হাজির করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে তাদের ট্রাইব্যুনালে তোলা হয়। আজ এ মামলার রায় ঘোষণা করা হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল রায় ঘোষণা করবেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
এর আগে গত ২৪ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হলে রায়ের জন্য আজকের দিন ধার্য করা হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠনের প্রায় আট মাস পর এই মামলার রায় ঘোষণা হচ্ছে। এটি ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় দ্বিতীয় রায় হতে যাচ্ছে।
এর আগে গত বছরের ১৭ নভেম্বর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর দুই শীর্ষ সহযোগীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার প্রথম রায় ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনাল। ওই রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড এবং সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এ মামলার প্রসিকিউটর গাজী তামীম জানান, রাষ্ট্রপক্ষ ২৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দির পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ নথিপত্র, অডিও-ভিডিও ও ফরেনসিক প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করেছে। প্রমাণের মধ্যে রয়েছে শেখ হাসিনা ও শেখ ফজলে নূর তাপসের কথোপকথনের রেকর্ড, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের ওয়্যারলেস অডিও বার্তা, পুলিশের গুলিবর্ষণের ভিডিও ফুটেজ, নিহতদের মৃত্যুসনদ এবং ঘটনার দিন দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের অস্ত্র ইস্যুর নথি।
তিনি আরও বলেন, যেসব কর্মকর্তার নামে অস্ত্র ইস্যু করা হলেও তারা গুলি চালাননি, তারাও ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন। এসব প্রমাণের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এ কারণে সর্বোচ্চ শাস্তির পাশাপাশি পলাতক আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।
চানখাঁরপুল মামলার আট আসামি হলেন—ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ আলম মোহাম্মদ আখতারুল ইসলাম, রমনা জোনের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুল, শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক (অপারেশনস) আরশাদ হোসেন, কনস্টেবল সুজন, ইমাজ হোসেন ও নাসিরুল ইসলাম।
এদের মধ্যে আরশাদ, সুজন, ইমাজ ও নাসিরুল ইসলাম বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। অন্য চার আসামি পলাতক বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, জুলাই বিপ্লব চলাকালে নির্বিচারে গুলিবর্ষণের মাধ্যমে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় আসামিরা ষড়যন্ত্র, উসকানি, সহায়তা এবং সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি ভারতে পালিয়ে যান। একই সঙ্গে চারজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বা সর্বোচ্চ নেতৃত্বের দায়ও আনা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, হাবিবুর রহমান, সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও মোহাম্মদ ইমরুলসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরাসরি হত্যার নির্দেশ দেন, ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে নির্দেশনা দেন এবং হত্যাকাণ্ডে সহায়তা করেন।
মামলায় শহীদ হিসেবে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলেন—শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ মাহদি হাসান জুনায়েদ, মোহাম্মদ ইয়াকুব, রাকিব হাওলাদার, ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া।
গত ২০ এপ্রিল এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা প্রথম তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রথম সাক্ষী হিসেবে ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট সাক্ষ্য দেন শহীদ আনাসের বাবা শাহরিয়ার খান পলাশ। মামলায় মোট ২৬ জন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী এবং একজন আসামিপক্ষের সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন।




