ঢাকা | শনিবার
৩১শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৭ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ সমর্থনে সমালোচনা, প্রেস উইং দিল ব্যাখ্যা

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নে আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সমর্থন গণতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়।

রবিবার (১৮ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানায়। বিবৃতিতে বলা হয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারের প্রকাশ্য সমর্থন একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনের নিরপেক্ষতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে—এমন মন্তব্য সাম্প্রতিক সময়ে সামনে এসেছে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, অন্তর্বর্তী সরকারের ম্যান্ডেট ও আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চার প্রেক্ষাপটে এই সমালোচনার কোনো ভিত্তি নেই।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে এই সংকটময় সময়ে নীরবতা নিরপেক্ষতার প্রতীক নয়, বরং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের অভাব বোঝায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ম্যান্ডেট শুধু দৈনন্দিন রাষ্ট্র পরিচালনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের শাসনতান্ত্রিক সংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাটিয়ে দেশকে স্থিতিশীল করে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে প্রয়োজনীয় সংস্কারের কাঠামো তৈরি করার দায়িত্বে গঠিত। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস গত আঠারো মাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও তরুণদের সঙ্গে পরামর্শের মাধ্যমে যে সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছেন, বর্তমান সংস্কার প্যাকেজ তারই ফল—সুতরাং এ সংস্কারের পক্ষে অবস্থান না নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের মূল উদ্দেশ্যকে ভুল বোঝার সমান।

কার্যালয় বলেছে, আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চায় সরকার প্রধানদের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরিবর্তনসংক্রান্ত গণভোটে নীরব থাকার বাধ্যবাধকতা নেই; বরং জাতীয় স্বার্থে নীতি ও সংস্কারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর ছেড়ে দেওয়াই গণতন্ত্রের শুদ্ধ রীতি। গণভোটের বৈধতা নির্ভর করে ভোটারদের স্বাধীনভাবে মত দেওয়ার সুযোগ, বিরোধী পক্ষের প্রচারণার স্বাধীনতা ও প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতায়—এই শর্তগুলো বর্তমান প্রেক্ষাপটে অক্ষুণ্ণ রয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের সংস্কার গণভোট কোনো বিমূর্ত নীতিগত প্রশ্ন নয়; এটি দীর্ঘদিনের শাসনব্যর্থতার জবাব, যা দেশের প্রতিষ্ঠান দুর্বল করেছে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে সংকটে ফেলেছে। এই বাস্তবতায় সংস্কারের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টার অবস্থান ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহিতার প্রকাশ।

যারা সংস্কারের সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের নীরব থাকা দায়িত্বহীনতা। এছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে বহু দেশে সরকারপ্রধানরা জাতীয় পরিবর্তনসংক্রান্ত গণভোটে প্রকাশ্যে পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, যা গণতান্ত্রিক রীতির লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হয়নি।

কার্যালয় আরও উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গণভোটের ফলাফলের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো নির্বাচনী স্বার্থ জড়িত নেই; ড. ইউনূস ও উপদেষ্টারা ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা বা ব্যক্তিগত লাভ চান না। তাদের দায়িত্ব সীমিত সময়ের, এবং সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে বাস্তবায়ন হবে নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে। ফলে এই সমর্থনের উদ্দেশ্য সৎ এবং অযথা প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি সীমিত। জেলা পর্যায়ে প্রচারণা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও, এটি মূলত সংস্কারের বিষয়বস্তু ও গুরুত্ব জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্য; বিভ্রান্তি রোধে সরকারি অংশগ্রহণ স্বাভাবিক।

উপসংহারে কার্যালয় বলেছে, এই সময়ের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সমর্থনে নয়, বরং দ্বিধা ও নীরবতায়। যে সংস্কারের দায়িত্ব অন্তর্বর্তী সরকার নিয়েছে, সেটি সমর্থন না করলে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হতে পারে এবং পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা নষ্ট হতে পারে। ‘

হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ড. ইউনূসের অবস্থান সমর্থনযোগ্য কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারমুখী ম্যান্ডেট, প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের প্রয়োজন, আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চার সামঞ্জস্য এবং ভোটারদের প্রতি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নীতির সঙ্গে এটি মিল রেখে। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণেরই—নেতারা তা কেড়ে নেয় না, বরং সিদ্ধান্তকে স্পষ্ট ও অর্থবহ করতে সহায়তা করে।

সংবাদটি শেয়ার করুন