ঢাকা | শুক্রবার
৩০শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৬ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গাজা গণহত্যায় ইসরায়েলের পাশে আরব আমিরাত

গাজায় চলমান যুদ্ধে ইসরায়েলকে সরাসরি সামরিক, গোয়েন্দা ও লজিস্টিক সহায়তা দিতে লোহিত সাগরে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। ফাঁস হওয়া একটি গোপন নথি থেকে এই তথ্য সামনে এসেছে। অনুসন্ধানী প্ল্যাটফর্ম ‘এমিরেটলিকস’ দাবি করেছে, তারা নথিটি সংগ্রহ করেছে। নথিটির তারিখ অক্টোবর ২০২৩ এবং এটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের সশস্ত্র বাহিনীর যৌথ অভিযান কমান্ডের উদ্দেশে লেখা। লেখক হিসেবে উল্লেখ রয়েছে হামদান বিন জায়েদ আল-নাহিয়ানের নাম, যিনি আল-ধাফরা অঞ্চলের প্রতিনিধি ও ইউএই রেড ক্রিসেন্টের চেয়ারম্যান।

নথিতে বলা হয়েছে, ৭ অক্টোবরের ‘সন্ত্রাসী হামলা’ ও দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান ‘ঐতিহাসিক চুক্তি’ অনুযায়ী ইসরায়েলকে সহায়তা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যৌথ অভিযান কমান্ডের নির্দেশে দক্ষিণ লোহিত সাগরে অবস্থিত ইউএই সামরিক ঘাঁটিগুলো—যেমন ইয়েমেনের আল-মোখা, ইরিত্রিয়ার মাসাওয়া ও আসাব, এবং সোমালিয়ার ঘাঁটিগুলো—ইসরায়েলকে সহায়তার জন্য প্রস্তুত করা হয়। বিশেষভাবে ইয়েমেনের ঘাঁটিগুলোকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সক্ষমতা দিয়ে ইসরায়েলকে সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ ছিল।

নথিতে সরাসরি বলা হয়েছে, ‘ফিলিস্তিনে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরায়েলকে শক্তিশালী করা’ এবং ‘সন্ত্রাসীরা পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত’ এই সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে ‘সামাজিক সংহতি’ বাড়াতে তথাকথিত ‘কমিউনিটি উদ্যোগ’ চালানোর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া নথিতে ইসরায়েলের সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠ, সমন্বিত ও সমন্বয়পূর্ণ’ সহযোগিতা জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইসরায়েলকে এক বিলিয়ন ডলার মূল্যের গোয়েন্দা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি সরবরাহ করা হয়েছে।

ফাঁস হওয়া নথিতে কাতারের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। হামাসকে কাতারের সমর্থন এবং কুয়েতের ‘বিপুল আর্থিক সহায়তা’ দুই দেশকে ইউএইর রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে বিরোধপূর্ণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। নথিতে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েলের সঙ্গে ইউএইর পূর্ববর্তী সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, যা সহযোগিতা ও সংকটকালীন পরিস্থিতিতেও দেশটিকে পাশে দাঁড়াতে বাধ্য করে। ২০২০ সালের ‘ঐতিহাসিক চুক্তি’র পর থেকে সাংস্কৃতিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ২০২০ সালে ইউএই আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। এরপর থেকে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব সৌদি আরবসহ অন্যান্য আরব দেশকে চুক্তিতে যুক্ত করতে চাপ দিয়েছে। এর আগে ২০১৫ সালে ইয়েমেন যুদ্ধে ইউএই সেনাবাহিনী ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয়ে বিভিন্ন বন্দর, দ্বীপ ও নৌপথে বিস্তৃত সামরিক উপস্থিতি গড়ে তোলে। একইভাবে সোমালিয়ার উপকূলেও ইউএই ঘাঁটিগুলো স্থাপন করে।

গাজায় গণহত্যা শুরু হওয়ার পর থেকে আবুধাবি ইসরায়েলের সঙ্গে কৌশলগত সামরিক সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে এবং বর্তমানে ইউএই ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় আরব বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে বিবেচিত। ২০২৪ সালে অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘বালকান ইনসাইট’ প্রকাশ করে, ইউএই–সংযুক্ত প্রতিষ্ঠান ইয়ুগোইমপোর্ট–এসডিপিআর সামরিক বিমানের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৭১ লাখ ডলারের অস্ত্র ইসরায়েলে রপ্তানি করেছে, যা গাজায় চলমান গণহত্যায় ব্যবহার হয়েছে।

এছাড়া ইউএইভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাবেক মোসাদ প্রধানের সহ-প্রতিষ্ঠিত সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান এক্সএম সাইবারের সঙ্গে চুক্তি করেছে, যার লক্ষ্য জাতীয় জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এক্সএম সাইবার ইসরায়েলের শীর্ষ সামরিক প্রতিষ্ঠান রাফায়েলসহ অন্যান্য প্রতিরক্ষা কোম্পানির সঙ্গে একটি কনসোর্টিয়ামের অংশ হিসেবে কাজ করছে। নথি ও প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইউএইর রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা জোট ‘এজ’ ইসরায়েলের শীর্ষ অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রাফায়েল ও ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (আইএআই)-এর শেয়ারও ধারণ করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন