বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকিং খাতকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে এগোচ্ছে বলে জানিয়েছেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেছেন, ইসলামী ব্যাংকিং শুধু ধর্মীয় অনুভূতির বিষয় নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ও বাস্তবভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যা সঠিকভাবে পরিচালিত হলে দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নওয়াব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং কনফারেন্স’-এর দ্বিতীয় দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেন্ট্রাল শরীয়াহ বোর্ড ফর ইসলামিক ব্যাংকস অব বাংলাদেশ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগ যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করে।
গভর্নর বলেন, বর্তমানে দেশের মোট ব্যাংকিং সম্পদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ইসলামী শরীয়াহভিত্তিক হলেও বিনিয়োগের উপযুক্ত ক্ষেত্র সেই অনুপাতে তৈরি হয়নি। এর ফলে এসব ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। এই সংকট নিরসনে শরীয়াহসম্মত বন্ড বা সুকুক মার্কেট গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। একটি কার্যকর সুকুক বাজার চালু হলে সরকারের অর্থায়ন ব্যয় কমবে এবং একই সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট কমে পুরো খাত আরও স্থিতিশীল হবে।
ইসলামী ব্যাংকিংকে তাত্ত্বিকভাবে নিরাপদ অর্থায়ন ব্যবস্থা উল্লেখ করে আহসান এইচ মনসুর বলেন, যেহেতু এই ব্যবস্থায় ঋণ সরাসরি সম্পদ ও আয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাই ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে কিছু প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণের কারণে এই খাতে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে, যার বোঝা বইতে হয়েছে সাধারণ আমানতকারীদের। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতির জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যাংক ব্যবস্থাপনা, শরীয়াহ বোর্ড এমনকি আমানতকারীরাও দায় এড়াতে পারে না। বিশেষ করে আমানতকারীরা তাদের অর্থ কোথায় বিনিয়োগ হচ্ছে, সে বিষয়ে কখনোই যথেষ্ট প্রশ্ন তোলেননি।
খাতে আস্থা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর কথাও তুলে ধরেন গভর্নর। তিনি জানান, ইতোমধ্যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে এবং দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে অন্তত দুটি শক্তিশালী ও বৃহৎ ইসলামী ব্যাংক গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যারা সুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আমানতকারীদের সর্বোচ্চ সুবিধা দিতে পারবে। এ লক্ষ্য পূরণে ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি স্বতন্ত্র ইসলামী ব্যাংকিং আইন প্রণয়নের কাজ দ্রুত এগোচ্ছে বলেও তিনি জানান।
শরীয়াহ বোর্ডের সদস্যদের উদ্দেশে গভর্নর বলেন, তাদের আরও দৃঢ় ও সাহসী ভূমিকা নিতে হবে। চাকরি বা ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে কোনো অনিয়মের সঙ্গে আপস করা চলবে না। বেক্সিমকো সুকুকের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জোর করে বন্ড বিক্রির কারণে এই বাজারে মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সরকার এখন স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন সুকুক বাজার চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
সবশেষে গভর্নর কঠোর বার্তা দিয়ে বলেন, দেশে আর কোনো ধরনের আর্থিক লুটপাট বরদাশত করা হবে না। এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি সমাজের সব স্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন।




