ঢাকা | বৃহস্পতিবার
২৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৫ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি: ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ যেন লাখ লাখ টাকার খেলা

শেখ হাসিনা সরকারের দায়িত্বে থাকা সময়ে দেশের বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি ও অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। খুলনার খালিশপুরে ২৩৫ মেগাওয়াটের ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্র দুই বছর ধরে উৎপাদন না করলেও মাসিক ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ নেওয়া হয়েছে। একইভাবে ঘোড়াশালের রিজেন্ট ১০৮ মেগাওয়াটের কেন্দ্রও উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৩ শতাংশ বিদ্যুৎ গ্রিডে দিয়েছে, তবু মাসে ৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকার বেশি চার্জ নিচ্ছে। এ ছাড়া প্যারামাউন্ড কোম্পানি প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ৮৫ টাকা করে চার্জ নিয়ে ৫ বছরে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি আয় করেছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে অতিরিক্ত ১০০ কোটি ডলার বা ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ আদায় করা হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে পিডিবি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ৬ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি বিদ্যুৎ কিনেছে, যার মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জে গেছে ২ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। অপ্রয়োজনীয় কেন্দ্র স্থাপন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর নামে এই অনিয়মের ফলে কয়েকটি কোম্পানি লাভবান হয়েছে, কিন্তু দেশের অর্থনীতি ধ্বংসপ্রায় পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অনেক কেন্দ্র উৎপাদন সক্ষমতার ৪০ শতাংশের কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, তবু সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী পুরো ক্যাপাসিটি চার্জ নেওয়া হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে খালিশপুর কেন্দ্রকে ১৩ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা বিল দেওয়া হয়েছে। মধুমতি বাগেরহাট কেন্দ্র এক বছরে মাত্র ১ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও মাসে ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার চার্জ নিচ্ছে। সামিট, ওরিয়ন, ইউনাইটেডসহ অন্যান্য কেন্দ্রও সামগ্রিকভাবে কম উৎপাদন সত্ত্বেও বড় অঙ্কের চার্জ আদায় করছে।

এ ধরনের অনিয়মের ক্ষেত্রে বিশেষ আইনের সুযোগ নিয়ে যেসব কেন্দ্র বসানো হয়েছে, সেখানে কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়া ইচ্ছামতো চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পের আওতায় প্যারামাউন্ড, এপিআর এনার্জি, বাংলাট্রেক ও অন্যান্য কেন্দ্রগুলোতে কোটি কোটি টাকার বিল আদায় হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কাগজপত্র অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত পিডিবি ৬ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ কিনেছে, যার মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জ ২ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা এবং জ্বালানি খরচ ৩ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অপ্রয়োজনীয় কেন্দ্র অনুমোদন ও অসংখ্য প্রকল্পের অনুমোদনের ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। ২০২০-২০২১ সালে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ৬ দশমিক ৬১ টাকা হলেও ২০২৩-২০২৪ সালে তা বেড়ে ১১ দশমিক ৫১ টাকা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুগান্তরের অনুসন্ধান অনুসারে, বিদ্যুৎ খাতের এই অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি দেশ ও জনগণের অর্থনৈতিক স্বার্থকে বিপন্ন করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন