বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান গতিপ্রবাহ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জার্মানির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক-ভাল্টার স্টাইনমায়ার। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির কড়া সমালোচনা করে তিনি সতর্ক করেছেন—আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে বিশ্ব এক ভয়ংকর পরিণতির দিকে এগোতে পারে।
এক বক্তব্যে স্টাইনমায়ার বলেন, বিশ্ব যেন এমন এক ‘লুটেরাদের আস্তানায়’ পরিণত না হয়, যেখানে নীতিহীন শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো দেশ ও অঞ্চল দখল করে নেয়। তার এই মন্তব্যের পেছনে সাম্প্রতিক ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ঘটনা, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রক্রিয়ার প্রতিফলন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
কঠোর ভাষায় দেওয়া বক্তব্যে জার্মান প্রেসিডেন্ট ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে গণতন্ত্র বিশ্বজুড়ে নজিরবিহীন চাপে রয়েছে। ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই সংকটেরই একটি উদাহরণ, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের দুর্বল অবস্থানকে সামনে নিয়ে এসেছে।
যদিও জার্মান প্রেসিডেন্টের পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক, তবে স্টাইনমায়ারের বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। সক্রিয় দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকায় তিনি তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে পারেন।
স্টাইনমায়ার আরও বলেন, রাশিয়ার হাতে ক্রিমিয়া দখল এবং ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের সূচনা করেছিল। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বৈদেশিক আচরণ সেই ধারাবাহিকতায় আরেকটি বড় ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।
বুধবার গভীর রাতে এক সিম্পোজিয়ামে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্থপতি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই এখন মূল্যবোধের ভাঙন দেখা যাচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিমালা উপেক্ষিত হয়, তবে পৃথিবী এমন এক বাস্তবতায় পৌঁছাতে পারে, যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো পুরো অঞ্চল কিংবা দেশকে নিজেদের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করবে।
এই প্রেক্ষাপটে জার্মান জনমতেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থার বড় ধরনের অবনতি দেখা যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার জার্মানির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এআরডি পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী ৭৬ শতাংশ নাগরিক মনে করেন—যুক্তরাষ্ট্র এখন আর এমন কোনো অংশীদার নয়, যার ওপর জার্মানি নির্ভর করতে পারে। জুন ২০২৫ সালের তুলনায় এই হার তিন শতাংশ পয়েন্ট বেশি।
জরিপে মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন, যা এই নিয়মিত জরিপের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। বিপরীতে, প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জার্মান নাগরিক বলেছেন, তারা ফ্রান্স ও ব্রিটেনের ওপর নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে আস্থা রাখেন।
একই জরিপে দেখা গেছে, ৬৯ শতাংশ জার্মান ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। পাশাপাশি, প্রায় সমান সংখ্যক মানুষ মনে করেন—ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো আর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর আগের মতো নির্ভর করতে পারছে না, যদিও যুক্তরাষ্ট্রই জোটটির সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্য।




