ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নগদ অর্থ, ব্যাংক আমানত, জমি, ফ্ল্যাট ও ব্যবসায়িক সম্পদের দিক থেকে তাঁদের মধ্যে রয়েছে বিস্তর পার্থক্য। কেউ কেবল ব্যাংক ইন্টারেস্ট ও সঞ্চয়পত্রের আয়ে নির্ভরশীল, আবার কেউ বিপুল ভাড়া ও ব্যবসায়িক আয়ে কোটি টাকার মালিক।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আয়কর রিটার্নে মোট ১ কোটি ৯৬ লাখ ৮০ হাজার ১৮৫ টাকার সম্পদের তথ্য দিয়েছেন। তাঁর হাতে নগদ ও ব্যাংকে জমা মিলিয়ে রয়েছে ৩১ লাখ ৫৮ হাজার ৪২৮ টাকা। নিজ নামে বাড়ি বা বাণিজ্যিক স্থাপনা না থাকলেও এফডিআর, সঞ্চয়ী আমানত ও অন্যান্য আমানত রয়েছে। শেয়ার, বন্ড ও ব্যাংক আমানত থেকে তাঁর বার্ষিক আয় ৬ লাখ ৭৬ হাজার ৩৫৩ টাকা, যার বিপরীতে তিনি আয়কর দিয়েছেন ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৭১৩ টাকা।
তারেক রহমানের তুলনায় জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের হাতে নগদ অর্থ প্রায় দ্বিগুণ। ঢাকা-১৫ আসনের এই প্রার্থী হলফনামায় উল্লেখ করেছেন, তাঁর হাতে রয়েছে ৬০ লাখ ৭৬ হাজার ৪৯৭ টাকা। কৃষি খাত থেকে বছরে আয় করেন ৩ লাখ টাকা। পাশাপাশি তাঁর রয়েছে কৃষিজমি, অকৃষিজমি ও একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী হিসেবে শিক্ষকতা ও পরামর্শক পেশা থেকে বছরে আয় দেখিয়েছেন ১৬ লাখ টাকা। তাঁর হাতে নগদ ১৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ব্যাংকে জমা আছে প্রায় ৪ লাখ টাকা। গয়না ও অন্যান্য সম্পদ মিলিয়ে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ৩২ লাখ টাকার বেশি।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বার্ষিক আয় প্রায় পৌনে ১২ লাখ টাকা। কৃষি, ব্যবসা, পরামর্শক ফি ও ব্যাংক মুনাফা মিলিয়ে এই আয় আসে। তাঁর হাতে নগদ রয়েছে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকার বেশি। শেয়ার, গাড়ি, সোনা ও জমিজমা মিলিয়ে আয়কর রিটার্নে তিনি দেড় কোটির বেশি টাকার সম্পদের হিসাব দিয়েছেন।
ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস হলফনামায় সবচেয়ে বেশি সম্পদের তথ্য দিয়েছেন। নগদ অর্থ, ব্যাংক আমানত, এফডিআর, শেয়ার ও বিদেশি মুদ্রা মিলিয়ে তাঁর সম্পদের পরিমাণ ৫০ কোটির বেশি। রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট, গাড়ি, আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ শেয়ার বিনিয়োগ।
কক্সবাজার-১ আসনের প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমদের বার্ষিক আয় ৬ কোটি টাকার বেশি। কৃষি, ব্যবসা, চাকরি ও অন্যান্য উৎস থেকে এই আয় আসে। তাঁর হাতে নগদ ও ব্যাংক আমানত মিলিয়ে রয়েছে প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। তিনটি গাড়ি, স্বর্ণ ও শেয়ার বাজারে বিনিয়োগও রয়েছে তাঁর।
চট্টগ্রাম-১১ আসনের প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আয়কর রিটার্নে ১০ কোটির বেশি টাকার সম্পদের হিসাব দিয়েছেন। ব্যবসা থেকে আয় করা এই নেতা বছরে সাড়ে ২৪ লাখ টাকার বেশি আয়কর পরিশোধ করেছেন।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ও নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের হলফনামাতেও নগদ অর্থ, জমি ও শেয়ারের তথ্য উঠে এসেছে। তাহের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মানী বাবদ ১০ লাখ টাকার বেশি আয় দেখিয়েছেন।
এনসিপির সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলমের সম্পদ তুলনামূলক কম হলেও নগদ অর্থ ও ব্যবসায়িক আয়ের তথ্য রয়েছে তাঁদের হলফনামায়। গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৯০ লাখ টাকা।
স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা, তাসনিম জারা এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের হলফনামায়ও নগদ অর্থ, বাড়িভাড়া, জমি, গাড়ি ও দেনার বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মো. ফয়জুল করীম শিক্ষকতা ও মাহফিল থেকে পাওয়া হাদিয়ার আয়ের তথ্য তুলে ধরেছেন।
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা রাজনীতির অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি স্পষ্ট ছবি তুলে ধরেছে, যেখানে কারও সম্পদ কোটি ছাড়িয়েছে, আবার কেউ সীমিত আয়ের মধ্যেই নির্বাচনী মাঠে নেমেছেন।




