ঢাকা | শুক্রবার
৩০শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৬ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সালতামামি ২০২৫: সাফল্যের হাসি বনাম না পাওয়ার বেদনা

২০২৫ বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে। নতুন বছরের ভোর প্রায় এসে গেছে। পেছনে তাকালে চোখে পড়ে এক বছরের জমে থাকা অম্ল-মধুর স্মৃতি কোথাও উচ্ছ্বাসের হাসি, কোথাও হতাশার দীর্ঘশ্বাস, আবার কোথাও ইতিহাস ছুঁয়ে ফেলার নীরব গর্ব। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এই বছরটি ছিল সংগ্রাম, বিদ্রোহ, বিদায় আর বিজয়ের এক যৌথ কাব্য।

ফুটবলের নতুন আলো: হামজা চৌধুরী

বাংলাদেশ ফুটবলের আকাশে ২০২৫-এর সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র নিঃসন্দেহে হামজা চৌধুরী। লাল-সবুজের জার্সিতে তার অভিষেক ছিল শুধু একজন প্রবাসী ফুটবলারের মাঠে নামা নয় এ ছিল দীর্ঘদিন ঘুমিয়ে থাকা স্বপ্নকে জাগিয়ে তোলার সাহসী মুহূর্ত। গ্যালারিতে ফিরল প্রাণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জন্ম নিল নতুন উন্মাদনা।

৫ মার্চ, ২০২৫ দিনটি বাংলাদেশ ফুটবলের ক্যালেন্ডারে বিশেষ হয়ে থাকবে। শিলংয়ে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে ভারতের বিপক্ষে হামজার অভিষেক ম্যাচে জয়ের খুব কাছে গিয়েও ড্রয়ে থামতে হয় বাংলাদেশকে। কূলে এসে তরী ডোবার মতো এক অনুভূতি। তবে অপেক্ষা দীর্ঘ হয়নি। পরের প্রীতি ম্যাচেই নেপালের বিপক্ষে হেডে গোল করে নিজের আগমনের বার্তা দেন তিনি।

এরপর খুব অল্প সময়েই হামজা হয়ে ওঠেন দলের নির্ভরতার নাম। সাত ম্যাচে চার গোল করা এই ডিফেন্ডারের সবচেয়ে বড় অবদান আসে ২২ বছর পর ভারতের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ে যেখানে তার উপস্থিতি গড়ে দেয় অটল রক্ষণভিত্তি।

হামজার হাত ধরে জাতীয় দলে যুক্ত হন আরও কয়েকজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রবাসী ফুটবলার সমিত সোম, ফাহমিদুল ইসলাম, জায়ান হাকিম ও কিউবা মিচেল। তাদের আগমনে জাতীয় দলে তৈরি হয় গভীরতা ও ভবিষ্যতের নতুন সম্ভাবনা।

৪৫ বছরের অপেক্ষা ভেঙে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ আবার এশিয়ান কাপের মূলপর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। পুরো বছরে জাতীয় দল খেলেছে ১০টি ম্যাচ জয় তিনটি, হার তিনটি, ড্র চারটি। সংখ্যার বাইরে যে বিষয়টি বড় হয়ে ধরা দিয়েছে, তা হলো আত্মবিশ্বাসের প্রত্যাবর্তন।

সাবিনাদের বিদ্রোহ, তারপর ইতিহাস

বছরের শুরুতেই নারী ফুটবল হয়ে ওঠে ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। সাবিনা খাতুন, সানজিদা, শামসুন্নাহার, ঋতুপর্ণা, মাসুরা, মনিকাসহ ১৮ জন ফুটবলারের ‘কোচ হটাও’ আন্দোলনে কেঁপে ওঠে দেশের ক্রীড়াঙ্গন। দলীয় অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা আর চাপের ভেতর দিয়েই যেতে হয় তাদের।

তবু সংকট থামাতে পারেনি স্বপ্ন। আফঈদা খন্দকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো নারী এশিয়ান কাপের মূলপর্বে জায়গা করে নেয়। শুধু তাই নয়, অনূর্ধ্ব-২০ নারী দলও এশিয়ান কাপের টিকিট নিশ্চিত করে প্রমাণ করে দেয়, লড়াই শুধু কথায় নয়, খেলাতেও।

ফিফার নিষেধাজ্ঞা ও ঘরোয়া ফুটবলের রূপান্তর

ক্লাব ফুটবলে বছরটি ছিল অস্বস্তিকর। ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবের ওপর ট্রান্সফার নিষেধাজ্ঞা দেয় ফিফা। উজবেক ফুটবলার সারদর জাখোনভের বকেয়া পারিশ্রমিক পরিশোধে ব্যর্থতার ফলেই এই সিদ্ধান্ত আসে।

বছরের শেষ দিকে ঘরোয়া লিগেও আসে বড় পরিবর্তন। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার ফুটবল লিগ (বিপিএল) নতুন নাম পায় বাংলাদেশ ফুটবল লিগ (বিএফএল)। নাম বদলালেও কাঠামোগত উন্নয়নের প্রশ্ন রয়ে যায় আগের মতোই।

ক্রিকেটে ওঠানামার বছর

ক্রিকেটে ২০২৫ ছিল মিশ্র আবেগের বছর। ওয়ানডেতে নিজেদের সবচেয়ে প্রিয় ফরম্যাটেই সবচেয়ে বেশি অচেনা ছিল বাংলাদেশ। পাকিস্তানে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে একটি ম্যাচও জিততে না পারা সেই হতাশার শুরু।

পুরো বছরে ১১টি ওয়ানডেতে জয় মাত্র তিনটি, হার সাতটি, একটি পরিত্যক্ত। পরিসংখ্যানই বলে দেয় পথ হারানোর গল্প।

টেস্ট ক্রিকেটে ফল কিছুটা ভালো দেখালেও তাতে পুরো স্বস্তি আসেনি। ছয় টেস্টে তিন জয়, দুই হার ও একটি ড্র। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ ড্র, শ্রীলঙ্কা সফরে হার, আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ২-০ জয় সব মিলিয়ে এক অসম্পূর্ণ তৃপ্তি।

টি-টোয়েন্টিতে অবশ্য ম্যাচ ও গল্প দুটোই ছিল বেশি। ৩০টি ম্যাচে ১৫ জয়, ১৪ হার ও একটি পরিত্যক্ত। ব্যাটিংয়ে আলো ছড়ান তানজিদ হাসান তামিম ৮১৪ রান, আটটি ফিফটি ও এক বছরে রেকর্ড ৪১টি ছক্কা। বোলিংয়ে মোস্তাফিজুর রহমান ছুঁয়ে ফেলেন অনন্য মাইলফলক ১৫৮ উইকেট নিয়ে টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হন তিনি।

বোর্ডরুমের অস্থিরতা

মাঠের বাইরেও শান্ত ছিল না বছরটি। বিসিবি সভাপতির পদ হারান ফারুক আহমেদ। অন্তর্বর্তী দায়িত্ব শেষে অক্টোবরে নির্বাচনের মাধ্যমে নিয়মিত সভাপতি হন আমিনুল ইসলাম বুলবুল। তবে তার অধীনেই প্রথম বিভাগ লিগ বর্জন করে আটটি ক্লাব যা দেশের ক্রিকেট কাঠামোর ভেতরের অসন্তোষের ইঙ্গিত দেয়।

মুশফিকের শততম টেস্ট বছরের উজ্জ্বল মুহূর্ত

নভেম্বরে আসে বছরের সবচেয়ে স্মরণীয় দৃশ্য। মিরপুরে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে দেশের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে শততম টেস্ট খেলেন মুশফিকুর রহিম। প্রথম ইনিংসে ১০৬, দ্বিতীয় ইনিংসে অপরাজিত ৫৩ শততম টেস্টে সেঞ্চুরি করা বিশ্বের মাত্র ১১তম ব্যাটার হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখান তিনি।

জুনিয়র হকি: সীমাবদ্ধতা ভেঙে বিস্ময়

অল্প প্রস্তুতি, সীমিত সুযোগ এই চেনা বাস্তবতার মধ্যেই জুনিয়র হকি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ লিখে ফেলে অনন্য গল্প। ২৪ দলের টুর্নামেন্টে ১৭তম হয়ে চ্যালেঞ্জার্স ট্রফি জয় শুধু একটি ট্রফি নয়, এটি ছিল প্রতিরোধের ভাষ্য।

ফাইনালে অস্ট্রিয়াকে ৫–৩ ব্যবধানে হারিয়ে শিরোপা জেতে বাংলাদেশ। এই সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন আমিরুল ইসলাম—১৮ গোল, চারটি হ্যাটট্রিক। তার সঙ্গে রাকিবুল হাসানসহ আরও কয়েকজন তরুণ প্রথমবার বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়ান।

নীরব সাফল্যের বছর

নারী কাবাডিতে বিশ্বকাপে প্রথমবার ব্রোঞ্জ, ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে টেবিল টেনিসে খই খই সাই মারমার ঐতিহাসিক রুপা, ঢাকায় এশিয়ান আর্চারিতে পদক, দাবায় নোশিন আনজুমের টানা তৃতীয় শিরোপা সব মিলিয়ে ২০২৫ প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশের আলো শুধু ক্রিকেটেই সীমাবদ্ধ নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন