২০২৫ সাল দেশের শিক্ষাখাতের জন্য ছিল একটি চ্যালেঞ্জের বছর। বছরের শুরু থেকে বিভিন্ন অপ্রত্যাশিত ঘটনার ধাক্কায় শিক্ষার্থীরা এবং শিক্ষকরা শিক্ষার মূল কার্যক্রম পরিচালনায় কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবই বিলম্বিত বিতরণ, শিক্ষক আন্দোলন এবং পরীক্ষার ফলাফলের ধস বছরের বিভিন্ন সময়ে শিক্ষাব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত করেছে।
বছরের শুরুতে সময়মতো পাঠ্যবই না পাওয়ায় শিক্ষার্থীরা প্রায় আড়াই মাস শিক্ষাদানে চরম অসুবিধার মুখোমুখি হন। ধীরে ধীরে বই বিতরণ স্বাভাবিক হলেও পাঠদান প্রক্রিয়ার উপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নতুন মাত্রা পায়। এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার মাত্র ৬৮.৪৫ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় ১৪.৫৯ শতাংশ কম এবং গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। প্রায় ১৯ লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ১৩ লাখ শিক্ষার্থী। ইংরেজি ও গণিতে ব্যাপক ফেল হয়েছে। বরিশাল বোর্ডে পাসের হার ৫৬.৩৮ শতাংশ, আর রাজশাহী বোর্ডে সর্বোচ্চ ৭৭.৬৩ শতাংশ।
ফলাফলের বিপর্যয়ে শিক্ষার্থীরা পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করেন। প্রায় ২ লাখ শিক্ষার্থী ৪ লাখ খাতার পুনঃনিরীক্ষণের দাবি জানান। ফেল থেকে পাস ১৪৭৯ জন, জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৫৫৫ শিক্ষার্থী। জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৩ হাজার কমে এক লাখ ৩৯ হাজারে নেমেছে। মেয়েদের পাসের হার ৭০.৬৭ শতাংশ, ছেলেদের ৬৫.১১ শতাংশ।
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলও একই ধারা অনুসরণ করে। ১১টি বোর্ডের গড় পাসের হার ৫৮.৮৩ শতাংশ, যা গত ২১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অংশগ্রহণকারী ১২ লাখ ৩৫ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ৭ লাখ ২৬ হাজার। শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০২। ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. খন্দোকার এহসানুল কবির জানান, এই ফল কেবল সংখ্যার পতন নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি গুণগত দুর্বলতা ও অব্যবস্থাপনার প্রতিফলন।
২০২৫ সালে শিক্ষকদের আন্দোলন চলেছিল বছরের প্রায় পুরো সময়। ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নন-এমপিও এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা বেতন, ভাতা, গ্রেড ও চাকরির নিরাপত্তার দাবিতে বিভিন্ন সময়ে কর্মবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচি চালান। সরকারের আশ্বাস পেয়ে কখনো আন্দোলন স্থগিত হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধান দেখা যায়নি।
শেষ পর্যন্ত সরকার এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাড়িভাড়া ভাতা ৭.৫ শতাংশ বৃদ্ধি করে এবং ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি করার আশ্বাস দেয়। তবে দীর্ঘ আন্দোলনের কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়। নভেম্বরের শেষে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা তিন দফা দাবিতে পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালন করেন। তাদের প্রধান দাবি ছিল– ১১তম গ্রেড প্রদান, শতভাগ পদোন্নতি নিশ্চিতকরণ ও উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির জটিলতা নিরসন।
শিক্ষকরা বার্ষিক পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিলে দেশের প্রায় ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষার ওপর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সরকারের কঠোর অবস্থানের পর ৪২ জন শিক্ষককে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়। এরপর শিক্ষকরা আন্দোলন প্রত্যাহার করে ৭ ডিসেম্বর থেকে পরীক্ষা স্বাভাবিকভাবে শুরু হয়।
দীর্ঘ ১২ বছর পর অষ্টম শ্রেণির জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা ফের চালু হয়। ২০২৫ সালে এই পরীক্ষায় তিন লাখ ৪৬ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে ৪০০ নম্বরের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ২৮ থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারাদেশের ৬১১টি কেন্দ্রে পরীক্ষা পরিচালিত হচ্ছে।
প্রাথমিক স্তরের পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা পুনরায় চালুর চেষ্টা আইনি জটিলতায় স্থগিত হয়। আদালত বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও পরীক্ষায় অংশগ্রহণের নির্দেশ দিলে প্রস্তুতি আবারও অনিশ্চয়তায় পড়ে। শিক্ষা প্রশাসন জানিয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।
২০২৫ সাল ছিল শিক্ষাখাতের জন্য চ্যালেঞ্জ, সংকট ও অস্থিরতার বছর। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রশাসনের মধ্যে বিভিন্ন জটিলতা শিক্ষার মান ও কার্যক্রমকে সরাসরি প্রভাবিত করেছে।




