ঢাকা | বৃহস্পতিবার
২৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৫ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নিরাপদ না হলে মাছ উৎপাদন বাড়িয়ে লাভ নেই

দেশে মাছ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও এর গুণগত মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি বলেন, কেবল উৎপাদন বাড়ালেই চলবে না—ভোক্তার জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ মাছ নিশ্চিত করাই হতে হবে মূল লক্ষ্য। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত না হলে মাছ উৎপাদনের সাফল্য অর্থহীন হয়ে পড়বে।

ফরিদা আখতার বলেন, অ্যাকুয়াকালচারে উৎপাদিত মাছ যদি মানবস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ না হয়, তবে সেটিকে প্রকৃত অর্থে মাছ বলা যায় না। খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই মৎস্য খাতের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।

তিনি উল্লেখ করেন, মাছ কেবল পেট ভরানোর উপাদান নয়; এটি মানুষের জন্য অত্যাবশ্যক পুষ্টির এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস। মাছের মাধ্যমে প্রাপ্ত মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট, ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য উপাদান চোখের দৃষ্টি, হাড়ের গঠন এবং মেধা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাঙালি জাতির মেধা বিকাশের সঙ্গেও মাছভিত্তিক খাদ্যাভ্যাস গভীরভাবে জড়িত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমা থাকলেও এর সম্ভাবনার মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ এখনো ব্যবহার করা হচ্ছে। উপরন্তু যেটুকু আহরণ হচ্ছে, সেখানেও রয়েছে ব্যবস্থাপনাগত নানা দুর্বলতা ও ঝুঁকি।

সমুদ্রে অতিরিক্ত মাছ আহরণ নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, আর্টিসনাল ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলার ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে মাছ ধরছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারে ব্যবহৃত আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে সোনার ব্যবহারের ফলে একবারে অতিরিক্ত মাছ আহরণ করা হচ্ছে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি।

তিনি জানান, বর্তমানে ২২৩টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারের মধ্যে প্রায় ৭০টিতে সোনার প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে, যা ওভারফিশিংয়ের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে শক্তিশালী ও যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।

এ প্রেক্ষাপটে ফরিদা আখতার জানান, সরকার জাতীয় মৎস্য নীতিমালা হালনাগাদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মৎস্য আইনে ইতোমধ্যে কিছু সংস্কার আনা হলেও আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় সংযোজনের প্রয়োজন রয়েছে, যা তিনি তার দায়িত্বকালেই বাস্তবায়ন করতে আগ্রহী।

ক্ষতিকর মাছ ধরার সরঞ্জাম ব্যবহারের বিষয়েও তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার ভাষায়, পুরোনো গিয়ারকে রূপান্তর করে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, এমনকি কোথাও কোথাও ইলেকট্রিক শক দিয়েও মাছ ধরা হচ্ছে—যা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।

মৎস্যজীবীদের প্রণোদনার ক্ষেত্রেও বৈষম্যের কথা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, কৃষি খাতের তুলনায় মৎস্যজীবীরা কম সহায়তা পান। নিষেধাজ্ঞার সময় পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়ায় অনেক জেলে বাধ্য হয়ে নিয়ম ভাঙেন, যা একটি কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।

ইলিশ প্রসঙ্গে ফরিদা আখতার বলেন, নদীর নাব্যতা হ্রাস, দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইলিশের প্রজনন ও অভিবাসন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ইলিশ শুধু একটি মাছ নয়, এটি জাতীয় সম্পদ; তাই ডলফিন সংরক্ষণের মতো ইলিশ সংরক্ষণও বৈশ্বিক উদ্যোগের অংশ হওয়া উচিত।

তিনি আরও জানান, ইলিশের মাইগ্রেশন রুটে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ড্রেজিং কার্যক্রম গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওয়ার্ল্ডফিশ বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. ফারুক-উল ইসলাম। তিনি গবেষণালব্ধ তথ্যের মাধ্যমে টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং নীতিনির্ধারকদের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

সংবাদটি শেয়ার করুন