দীর্ঘ পনেরো বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সম্প্রতি ভারত সফর শেষ করেছেন ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা তারকা লিওনেল মেসি। ‘গোট ইন্ডিয়া ট্যুর’ (GOAT India Tour) নামে আলোচিত এই সফর শুরুতে ভক্তদের উচ্ছ্বাসে ভরে উঠলেও, সফর-পরবর্তী সময়ে তা রূপ নিয়েছে বিতর্ক আর তদন্তের ঘূর্ণিপাকে। আয়োজক শতদ্রু দত্তের গ্রেপ্তার এবং তদন্তকারীদের কাছে দেওয়া তাঁর স্বীকারোক্তি ঘিরে সামনে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
১০০ কোটি রুপির ‘মেগা’ আয়োজন, সবচেয়ে বড় অংশ মেসির ঝুলিতে
এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মেসির সংক্ষিপ্ত এই ভারত সফরের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০০ কোটি রুপিতে। এর মধ্যে একাই ৮৯ কোটি রুপি নিয়েছেন বিশ্বকাপজয়ী এই আর্জেন্টাইন তারকা, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২১ কোটি টাকারও বেশি। এছাড়া ভারত সরকারকে কর হিসেবে দিতে হয়েছে আরও ১১ কোটি রুপি।
আয়োজক শতদ্রু দত্ত তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, সফরের মোট ব্যয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ এসেছে স্পনসরশিপ ও টিকিট বিক্রির অর্থ থেকে। তবে তাঁর হিমায়িত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাওয়া ২০ কোটি রুপির উৎস ঘিরে তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন। এই অর্থ কোথা থেকে এলো, তা খতিয়ে দেখতে বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গভীর তদন্তে নেমেছে। গত শুক্রবার শতদ্রুর বাসভবনে তল্লাশি চালিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রও জব্দ করা হয়েছে।
কেন বিরক্ত ছিলেন মেসি?
সফর চলাকালে একাধিক অনুষ্ঠানে লিওনেল মেসির অস্বস্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শতদ্রু দত্তের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, বিদেশি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা আগেই সতর্ক করেছিলেন মেসি কারও জড়িয়ে ধরা বা অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক স্পর্শ একেবারেই পছন্দ করেন না।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। ভারতের চারটি শহরে সফরের সময় বারবার মাইকিং করা হলেও ভক্তদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। অনাকাঙ্ক্ষিত আলিঙ্গন ও স্পর্শের চেষ্টায় বিরক্ত হয়ে পড়েন মেসি। পরিস্থিতি এতটাই বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে যে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই একাধিক অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি।
ক্রীড়ামন্ত্রীর আচরণে নতুন বিতর্ক
এই সফরের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি পশ্চিমবঙ্গের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকে ঘিরে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি মেসির খুব কাছে গিয়ে কোমরে হাত রেখে ছবি তুলছেন। অভিযোগ উঠেছে, তাঁর প্রভাবেই স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা বলয় ভেঙে পড়ে এবং নিয়ন্ত্রণহীন ভিড় ঢুকে পড়ে মাঠে।
আয়োজকদের দাবি, যেখানে মাত্র ১৫০টি গ্রাউন্ড পাসের অনুমতি ছিল, সেখানে এক ‘প্রভাবশালী’ ব্যক্তির আগমনের পর ভিড় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় তিনগুণ। এতে পুরো নিরাপত্তা ও অনুষ্ঠান পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। ক্রমবর্ধমান সমালোচনা ও রাজনৈতিক চাপের মুখে নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে অরূপ বিশ্বাস ইতিমধ্যে মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন।
এসআইটির তদন্তের কেন্দ্রে কী?
বর্তমানে স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (এসআইটি) তদন্ত করছে—কার নির্দেশে অতিরিক্ত ভিড় স্টেডিয়ামে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কারা ছাড় দিয়েছিল এবং ১০০ কোটি রুপির এই বিশাল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ছিল কি না। মেসির বহুল প্রতীক্ষিত ভারত সফর এখন আর শুধু স্মরণীয় আয়োজন নয়, বরং পরিণত হয়েছে এক বড় রাজনৈতিক ও আর্থিক কেলেঙ্কারির অনুসন্ধানে।




