ঢাকা | বৃহস্পতিবার
২৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১৫ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মা-মেয়ে হ’ত্যার: এক মোবাইল নম্বরেই যেভাবে উদঘাটন হল আসল রহস্য

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোডে মা লায়লা আফরোজ (৪৮) ও মেয়ে নাফিসা লাওয়াল বিনতে আজিজকে (১৫) নির্মমভাবে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনার তিন দিনের মাথায় রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত গৃহকর্মী আয়েশাকে তার স্বামী রাব্বিসহ ঝালকাঠির নলছিটি থেকে বুধবার (১০ ডিসেম্বর) ভোরে গ্রেপ্তার করা হয়।

বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) মিন্টো রোডের ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত কমিশনার এন এস নজরুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের পুরো নেপথ্য কাহিনি তুলে ধরেন।

নজরুল ইসলাম জানান, ৮ ডিসেম্বর সকালে এই হত্যাকাণ্ডের পর মামলার বাদী নতুন গৃহকর্মী আয়েশার নাম সন্দেহভাজন হিসেবে উল্লেখ করলেও তাকে শনাক্ত করা ছিল পুলিশের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ। কারণ গৃহকর্মীর কোনো ছবি নেই, নেই এনআইডি বা মোবাইল নম্বর, সিসিটিভিতেও স্পষ্ট পরিচয়ধারণের সুযোগ নেই, কারণ তিনি সবসময় বোরকা ও নেকাব পরতেন।

কোনো ডিজিটাল ক্লু না পাওয়ায় তদন্তকারী দল ‘ম্যানুয়াল’ পদ্ধতিতে গত এক বছরের গৃহকর্মী-সংক্রান্ত অপরাধগুলো বিশ্লেষণ শুরু করে। বিশেষ করে গলায় পোড়া দাগযুক্ত এবং জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় বসবাসকারী গৃহকর্মীদের তথ্য যাচাই করা হয়।

এই অনুসন্ধানেই মিলল মোহাম্মদপুরের হুমায়ুন রোডের এক পুরোনো চুরির মামলার একটি মোবাইল নম্বর যা মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

কল ডেটা বিশ্লেষণে জানা যায়, নম্বরটি ব্যবহার করে রাব্বি নামের এক ব্যক্তি। তদন্তে উঠে আসে এই রাব্বির স্ত্রীই হলো পলাতক আয়েশা। বর্ণনা একেবারে মিলে যায় বাদীর দেওয়া তথ্যের সঙ্গে। এরপর তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় এবং মাঠ পর্যায়ের অভিযানের মাধ্যমে তাদের অবস্থান নিশ্চিত করে পুলিশ।

অবশেষে ঝালকাঠির নলছিটির চরকায়া গ্রামে দাদা-শ্বশুরবাড়ি থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় আয়েশার কাছ থেকে চুরি হওয়া একটি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আয়েশা হত্যার দায় স্বীকার করেন। তিনি জানান কাজে যোগ দেওয়ার দ্বিতীয় দিনই তিনি দুই হাজার টাকা চুরি করেন। চতুর্থ দিনের সকালে টাকা চুরি নিয়ে লায়লা আফরোজের সঙ্গে তর্ক বাধে। গৃহকর্ত্রী স্বামীকে ফোনে জানাতে গেলে আগে থেকে লুকিয়ে রাখা সুইচ গিয়ারের চাকু দিয়ে পেছন থেকে আঘাত করেন। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে লায়লা আফরোজ অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান।

এরপর মায়ের চিৎকার শুনে এগিয়ে আসা নাফিসা লাওয়ালকেও এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করেন আয়েশা। নাফিসা ইন্টারকমে গার্ডকে কল দিতে চাইলে আয়েশা ইন্টারকমের তার ছিঁড়ে ফেলেন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তারও মৃত্যু হয়।

পরে রক্তমাখা পোশাক বদলে নাফিসার স্কুলড্রেস পরে বাসা থেকে বের হয়ে যান। ঢাকা ছাড়ার পথে সিংগাইর ব্রিজ থেকে মোবাইল ও পোশাকভর্তি ব্যাগ নদীতে ফেলে দেন।

অতিরিক্ত কমিশনার জানান, আয়েশার আগেও চুরির ইতিহাস রয়েছে। এমনকি বোনের ঘর থেকেও টাকা ও স্বর্ণালংকার চুরি করেছিলেন তিনি।

এ সময় ঢাকাবাসীর প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়, গৃহকর্মী নিয়োগের আগে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করুন, পরিচয়পত্র সংগ্রহ করুন। কারণ এটি আপনার নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

সংবাদটি শেয়ার করুন