১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারতের উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় ঘটে ইতিহাসের এক বিতর্কিত ঘটনা। ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদে হামলা চালিয়ে ভিএইচপি, বিজেপি এবং শিব সেনার সমর্থকেরা মসজিদটি ধ্বংস করে। ওই ঘটনার পর সারা ভারতে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে দুই হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান।
ধ্বংসের সময় শিব সেনার তৎকালীন সক্রিয় কর্মী বলবীর সিং প্রথম আঘাতকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি করসেবক হিসেবে মসজিদ ভাঙার ঘটনায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তবে, সময়ের সঙ্গে তার জীবনপথ সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। আজ তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং নতুন নাম নিয়েছেন মোহাম্মদ আমির। তিনি লম্বা দাড়ি, টুপি ও আলখেল্লা পরে ভোরে আজান দেন এবং কোরআনের আলোকে জীবনধারণ করছেন। তার মুখে সর্বদা উচ্চারিত হয় ‘আল্লাহু আকবার’ ও ‘আলহামদুলিল্লাহ’।
যে মানুষ একসময় বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনায় সক্রিয় ছিলেন, আজ তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মসজিদ মেরামত ও পুনর্নির্মাণের কাজ করছেন। মোহাম্মদ আমির জানিয়েছেন, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে তিনি অন্তত ১০০টি মসজিদ নতুন করে নির্মাণ ও সংস্কারের শপথ নিয়েছেন। ১৯৯৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে তিনি উত্তর ভারতের বিভিন্ন এলাকায় ভেঙে পড়া অনেক মসজিদ ইতিমধ্যেই সংস্কার করেছেন।
বলবীর সিংয়ের জীবন রূপান্তর শুরু হয় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর। বাড়ি থেকে বিতাড়িত হন, স্ত্রীও পাশে ছিলেন না। এক সময় ভবঘুরের মতো জীবন কাটাতে হয়েছিল তাকে। এই কঠিন সময়ই তার জীবনে গভীর মানসিক পরিবর্তন আনে। বন্ধু যোগেন্দ্র পাল ইসলাম গ্রহণ করার পর তাকে প্রভাবিত করে এবং তিনি মাওলানা কলিম সিদ্দিকি-এর কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। সেই সময় তিনি নতুন নাম নেন মোহাম্মদ আমির।
বলবীর সিংয়ের আগে পরিচয় ছিল উগ্র হিন্দুত্ববাদী কর্মী হিসেবে। শিব সেনার নির্দেশে তিনি করসেবক হিসেবে অংশ নেন বাবরি মসজিদ ভাঙায়। ঘটনাস্থল থেকে ফেরার পর বীরোচিত সংবর্ধনা পেয়ে বাড়ি ফেরার পথে তার পরিবার তাকে ত্যাগের সিদ্ধান্তে বাধ্য করে। পরিবার ও সামাজিক পরিস্থিতির কারণে তাকে তার নিজের শহর ছাড়তে হয়েছিল।
পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণের পর মোহাম্মদ আমিরের জীবন সম্পূর্ণরূপে ধর্মের আলোকে এগোতে থাকে। তিনি এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মসজিদ মেরামত ও পুনর্নির্মাণে কাজ করছেন। বাবরি মসজিদ ধ্বংসে অংশ নেওয়ার প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, এবং তার লক্ষ্য অন্তত ১০০টি মসজিদ পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করা।
মোহাম্মদ আমিরের এই রূপান্তর শুধু এক ব্যক্তির জীবনের গল্প নয়, এটি একটি সমাজে ক্ষমা, পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও শান্তি স্থাপনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।




