বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে আগের তুলনায় অনেকটাই স্বস্তির জায়গায় অবস্থান করছে। তবে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, দেশীয় অর্থনৈতিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির প্রভাবের কারণে এখনও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ এবং এ নিয়ে চলমান আলোচনার বিষয়টি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক ইস্যুতে দরকষাকষির পথ এখনো খোলা রয়েছে এবং বাংলাদেশ এ বিষয়ে সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
মঙ্গলবার সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা জানান।
অর্থনীতি সংকট থেকে স্বস্তির জায়গায়:
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের অর্থনীতি একসময় কিনারায় ছিল, কিন্তু এখন অনেকটা স্থিতিশীল জায়গায় এসেছে। সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার বিভিন্ন সময়ে নানান উদ্যোগ নিয়েছে। অনেক কিছুই অর্জিত হয়েছে। তবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জ্বালানি খাতে অগ্রগতি, ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতি সঞ্চার এবং মূল্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্ববাজারের মন্দা, জ্বালানি সংকট ও মুদ্রাস্ফীতি পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতিকে চাপের মধ্যে ফেলেছিল। ডলারের সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং রিজার্ভের ঘাটতি অর্থনীতিকে নাজুক অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিল। তবে সরকারের নানা পদক্ষেপে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। আমরা এখন তুলনামূলক স্বস্তির জায়গায় এসেছি। তবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে,” বলেন অর্থ উপদেষ্টা।
প্রকল্প বাছাইয়ে সতর্কতা ও ব্যাংক খাতে সংস্কার:
সরকার এখন যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক, শুধুমাত্র সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এ বিষয়ে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, “অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে অপ্রয়োজনীয় বা অবাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পগুলো বাদ দেওয়া হচ্ছে।
ব্যাংক খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি জানান, ইতিমধ্যে কিছু সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং ডিসেম্বরের মধ্যেই দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে কাজ চলছে। তিনি বলেন, “ব্যাংকিং সেক্টরের দুর্বলতা দূর করতে এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সংস্কার জরুরি। এটি একটি ধাপে ধাপে সম্পন্ন হওয়ার প্রক্রিয়া।
নির্বাচনী প্রস্তুতি ও অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ:
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা জানান, প্রয়োজনীয় অর্থায়নে কোনো সমস্যা হবে না। নির্বাচন কমিশনের যে পরিমাণ অর্থ লাগবে, সরকার তা নিশ্চিত করবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রস্তুত করা হচ্ছে। নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে যেকোনো আর্থিক সহায়তা দিতে সরকার প্রস্তুত।”
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নিয়ে আলোচনার অগ্রগতি:
বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার। সম্প্রতি কিছু পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপের কারণে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা নতুন করে চাপে পড়েছেন। এ প্রসঙ্গে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, “এখনও কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি আস্থা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কোন কোন পণ্য আমদানি করা হবে এবং কোথায় শুল্ক হ্রাস করা যেতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কে সমঝোতার চেষ্টা চলছে এবং দরকষাকষির পথ খোলা রয়েছে। আমরা কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দুই দিক থেকেই কাজ করছি। আশা করছি, ভবিষ্যতে একটি ইতিবাচক সমাধান পাওয়া যাবে।”
বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও সীমাবদ্ধতা:
ড. সালেহউদ্দিন স্বীকার করেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কারণে বাংলাদেশের জন্য দরকষাকষি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম ও চীনের মতো দেশগুলো একই বাজারে প্রতিযোগিতা করছে। তিনি বলেন, সবকিছু প্রকাশ্যে বলা সম্ভব নয়। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনায় গোপন কৌশল থাকে। তবে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে খারাপ অবস্থানে নেই। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও উন্নত হবে বলে আশা করা যায়।
আগামী দিনের প্রত্যাশা:
ড. সালেহউদ্দিন আশা প্রকাশ করেন যে, সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন হলে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক ইস্যুতে সমঝোতা হলে রপ্তানিতে নতুন গতি আসবে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীলতার পথে এগোচ্ছে। আমাদের সতর্ক ও ধাপে ধাপে এগোতে হবে। শিগগিরই ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাবে।




