মঙ্গলবার, ১৬ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১লা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

মৌসুমি ফলের জমজমাট বাণিজ্য

মৌসুমি ফলের জমজমাট বাণিজ্য

মৌসুমি কাঁচা ফল উৎপাদনে খ্যাতি রয়েছে শেরপুরের নকলা উপজেলার। এখানকার উৎপাদিত বিভিন্ন মৌসুমি ফল রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করে যে লাভ হয়, তা দিয়েই চলে উপজেলার অর্ধশতাধিক ফল ব্যবসায়ীর পরিবার। ফল ব্যবসায়ীরা সাধারণত গ্রামে গ্রামে ঘুরে জলপাই, আম, জাম কাঁঠাল, কলা, পেঁপে, পেয়ারা, আমড়া, জাম্বুরা, তেঁতুল, বেল, আমলকী, কদবেল, নারিকেলসহ বিভিন্ন ফল মৌসুমের শুরুতেই কৃষকদের কাছ থেকে গাছ চুক্তি হিসেবে কিনে রাখেন। পরে বিক্রির উপযোগী হলে তা সংগ্রহ করে বাছাই করে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করেন। এখানকার ফল অপেক্ষাকৃত বড়, সুন্দর ও সুস্বাদু হওয়ায় সারাদেশে নকলার ফলের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রায় প্রতিদিন কয়েক ট্রাক ফল ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে।

মৌসুমি ফলের ব্যবসা করে সংসার ও ছেলে মেয়ের পড়ালেখার খরচ বহন করেন নকলা উপজেলার চরকৈয়া এলাকার মোজাম্মেল হক, রফিকুল ইসলাম, করিম মিয়া, সাদ্দাম হোসেন, বাবুল মিয়া ও শহিদুল, জালালপুরের আব্দুল মিয়া, কব্দুল আলী, তারা মিয়া, মস্তু মিয়া, শহিদুল ইসলাম, রতন, আশরাফ আলী, হলকু মিয়া, দুদু মিয়া ও আনার মিয়া, কায়দা এলাকার আবুল মিয়া, গেন্দু ও রহুল আমিন, সাহাপাড়া এলাকার রুপচাঁন, ধনাকুশা এলাকার আসাদুল, কবুতরমারীর এলাকার হরমুজ আলী, মো. হিরু

মিয়া ও নকলার লম্বু মিয়াসহ ৫০ থেকে ৬০ জন ফল ব্যবসায়ী।

ফল ব্যবসায়ীরা জানান, তারা সারা বছর বিভিন্ন মৌসুমি ফলের ব্যবসা করেন। মৌসুমের শুরুতেই তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে অগ্রীম টাকা দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম দামে মালিকদের কাছে গাছের ফল চুক্তি হিসেবে কিনে রাখেন। সময় হলে তথা পরিপক্ক হলে ওইসব ফল সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করেন। তারা মাসে অন্তত ১০ থেকে ১২ বার ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা শহরে কাঁচা ফল পাঠান।

আরও পড়ুনঃ  নারায়ণগঞ্জে পুলিশের হকার উচ্ছেদ অভিযান

তাদের দেয়া হিসেব মতে, বছরে ১২০ থেকে ১৪৪ বার কাঁচা ফল পাঠাতে পারেন তারা। প্রতি চালানে ১৫শ থেকে ২ হাজার টাকা তাদের লাভ থাকে। এতে করে প্রতি পাইকারের প্রতি বছর ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা থেকে ২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা করে লাভ হয়। এই লাভের টাকাতেই তাদের সারা বছরের সংসার খরচ ও সন্তানদের শিক্ষা খরচ চলে।

ফল ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হক বলেন, তিনি ৮ বছর ধরে ফল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। চলতি মৌসুমে তিনি ৬০ হাজার টাকায় ৫৫টি জলপাই গাছ কিনেছেন। জলপাই বিক্রি চলবে ৪৫ থেকে ৬০ দিন। এ দেড়-দুই মাসে তার অন্তত ৫০ হাজার টাকা লাভ বলে বলে আশা করছেন। তারা প্রথমে জলপাই গাছ থেকে সংগ্রহ করে ছোট ও বড় বাছাই করে তা বস্তা করেন। প্রতি বস্তায় ১২০ কেজি করে জলপাই ভরেন। ছোট আকাররে জলপাই প্রতি বস্তা এক হাজার ৬শ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা এবং বড় আকাররে জলপাই প্রতি বস্তা ২ হাজার ৫শ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকায়  বিক্রি করা হচ্ছে। ফল ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, মৌসুমি ফলের ব্যবসার আয় দিয়েই তিনি জীবীকা নির্বাহ করেন। তিনি ১০ বছর ধরে এই ব্যবসা করছেন। ফলের প্রতিটি মৌসুমে তিনি অন্তত ১০ থেকে ১৫টি চালান দিতে পারেন। প্রতি চালানে তার ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার ফল যায়। পরিবহন ব্যয়, ফল সংগ্রহের শ্রমিক ও ফলের মালিকের খরচ বাদে প্রতি চালানে লাভ থাকে ১৫শ’ টাকা থেকে দুই হাজার টাকা। জলপাই গাছের এক মালিক সুফিয়া বেগম বলেন, তার দুটি গাছ মওসুমের শুরুতে ৫ হাজার ২শ টাকায় বিক্রি করেছেন। প্রতি বছর তিনি জলপাই বিক্রির টাকায় দুই ছেলে-মেয়ের সারা বছরের খাতা, কলম কিনে দেওয়াসহ অন্যান্য কাজেও ব্যয় করতে পারেন। কৃষক কব্দুল হোসেন বলেন, মওসুমের শুরুতে একসাথে টাকা পাওয়ায় তা সংসারের বেশ কাজে লাগে। ব্যবসায়ীরা চুক্তিতে না কিনলে নিজেরা গাছ থেকে জলপাই সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করতে গেলে লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি হতো। মওসুমি ফল ব্যবসায়ীরা বলেন, সরকার যদি তাদের জন্য সহজ ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করতেন, তাহলে তাদের দেখাদেখি অনেকেই এই ব্যবসার প্রতি ঝুঁকতেন। এতে উপজেলার অনেকে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথ খুঁজে পেতেন, হতেন স্বাবলম্বী।

আরও পড়ুনঃ  নীল অর্থনীতিতে মার্কিন মডেল

 নকলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, নকলা উপজেলার মাটি আম, জাম কাঠাঁল, কলা, পেঁপে, পেয়ারা, জলপাই, আমড়া, জাম্বুরা, তেঁতুল, বেল, আমলকী, কদবেল ও নারিকেলসহ বিভিন্ন মওসুমি ফল চাষের জন্য বেশ উপযোগী। উপজেলায় অগণিত ফলদায়ী গাছ রয়েছে। এসব গাছের ফল অন্যান্য জেলায় যথেষ্ট কদর রয়েছে। ফল চাষ বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষকদের নিয়মিত উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। তাদেরকে কৃষি অফিস থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ সেবা দেওয়া হচ্ছে।

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন