শনিবার, ১৩ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ২৯শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান ওরা

স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান ওরা

হবিগঞ্জ শহরে ২৫০ হিজড়ার জন্য হিজড়াপল্লী ও সরকারি কর্মসংস্থানের দাবি

আমরা দেশের নাগরিক, নির্বাচনে আমাদের ভোটের অধিকার রয়েছে। অথচ, আমাদের জন্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা নাই। সরকারিভাবে আমাদের কাজের সুযোগ করে দিলে আমরা আর চাঁদাবাজি করবো না। আমরাও সকলের সঙ্গে সুন্দর ভাবে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে চাই: মাধুরী হিজড়া, গুরু মা, হবিগঞ্জ শহর

লিখিতভাবে আবেদন করলে তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে: ইশরাত জাহান, জেলা প্রশাসক, হবিগঞ্জ

হবিগঞ্জ জেলায় প্রায় ২৫০ জন হিজড়া বসবাস করছেন। এরমধ্যে হবিগঞ্জ শহর ও আশে পাশে রয়েছেন ৬০ থেকে ৭০ জন। এতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে হিজড়াদের সংখ্যা। সমাজে  অবহেলিত এ জনগোষ্ঠির উৎপাত ও চাঁদাবাজির ঘটনার অতিষ্ঠ জেলাবাসী। বিয়ের গাড়ি ও দোকান পাটে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে তারা। যে কারণে হিজড়া নামটি শুনলে মানুষের মনে কোন প্রকার সাহানুভূতির জন্ম নেয় না বরং হিজড়া নামটি সমাজের জন্য এখন এক আতঙ্কের নাম। বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ করেই তাদের জীবন চলে। এতে করে একদিকে তারা অপরাধ করলেও আইনশৃংখলা বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হয় না। অন্যদিকে স্বাভাবিক মানুষকে হিজড়া বানিয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ করানোর বিভিন্ন ঘটনা ইতিপূর্বে প্রকাশ পেয়েছে। তবে সমাজে হিজড়াদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারলে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে, এমনটাই জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। তাদের মতে, সামাজিকভাবে অবহেলার শিকার হওয়া ও কর্মসংস্থানের অভাবে এ জনগোষ্ঠী চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে।

আরও পড়ুনঃ  গো-খাদ্য সংকটে বিপাকে খামারি

এদিকে হিজড়া জনগোষ্ঠির জীবনমান উন্নয়নে প্রথমবারের মতো উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান। তিনি হবিগঞ্জ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে তাদেরকে সেলাই প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যোগ দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে জেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ের অধিনস্থ মোহনপুরে সমন্বিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধি শিক্ষা কার্যক্রম এর কার্যালয়ে দুটি ব্যাচে ৬০ জনকে হিজড়াকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এতে পুলিশ সুপার এস. এম মুরাদ আলি ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শৈলেন চাকমাসহ সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে ১২দিন ব্যাপী রিফ্রেসার্স প্রশিক্ষণ কোর্সের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক। জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিনের পরিচালনায় ও উপ-পরিচালক রাশেদুজ্জামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে এতে উপস্থিত ছিলেন সিলেট বিভাগীয় সমাজ সেবা কার্যালয়ের পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মিন্টু চৌধুরীসহ জেলা প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা।

এতে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় কয়েক জন হিজড়া জেলা প্রশাসকের কাছে পেশাগত সরকারি কাজের সুযোগের ব্যবস্থা ও পৌরসভার মধ্যে হিজড়া পল্লী করার দাবি জানায়। তাদের দাবি, সমাজে তারা অনেক অবহেলার স্বীকার। হিজড়া হিসাবে জন্মগ্রহন করায় তাদের বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজন তাদেরকে সমাজ থেকে তাড়িয়ে দেয়। পরে তারা গুরুমার আশ্রয়ে লালিত পালিত হয় এবং পেটের তাগিদে তারা চাঁদাবাজিসহ বিয়ের গাড়িতে আক্রমন করে। প্রশাসনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হলে চাঁদাবাজি করবে না বলেও তারা প্রশাসনকে জানায়। এ বিষয়ে পৃথকভাবে জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান ও পুলিশ সুপার এস.এম মুরাদ আলি শহরের নিকটে তাদের পুনর্বাসনের বিষয়ে আশ্বস্থ করেন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সকল ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে তাদেরকে জানান।

আরও পড়ুনঃ  ইউডায় ভর্তি মেলা শুরু

এ ব্যাপারে শহরের হিজড়াদের গুরু মা মাধুরী হিজড়া ওরফে জানু বলেন, ‘আমরা দেশের নাগরিক, নির্বাচনে আমাদের ভোটাধিকারের অধিকার রয়েছে। অথচ, আমাদের জন্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা নাই। সরকারিভাবে আমাদের কাজের সুযোগ করে দিলে আমরা আর চাঁদাবাজি করবো না। শহরের আশে-পাশে সরকারি জায়গায় বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিলে আমাদের জন্য উপকৃত হবে। আমরাও সকলের সঙ্গে সুন্দর ভাবে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে চাই’।

মানবাধিকার কর্মী তাহমিনা বেগম গিনি বলেন. হিজড়াদের জীবন মান উন্নয়নে সমাজসেবা কার্যালয় যে উদ্যোগ গ্রহন করেছে তা খুবই প্রশংসনীয়। হিজড়াদের বিভিন্ন উৎপাত ও বিয়ের গাড়িসহ দোকান পাটে চাঁদাবাজির ঘটনায় জেলাবাসী অতিষ্ঠ বলা যায়। সামাজিকভাবে অবহেলা ও কর্মসংস্থানের অভাবেই চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে। প্রশাসনিকভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে তাদের অনেক উপকার হবে। তবে হিজড়াপল্লী করা হলে সেটা শহরের বাহিরে হলে ভালো হবে।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান বলেন, হিজড়া জনগোষ্ঠি হলেও তারাও সমাজের অংশ, আমরা চাই তারাও ভালো থাকুক। বিভিন্ন সময়ে তাদেরকে আর্থিক সহয়তা প্রদান করা হয়েছে। তারা যদি স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে আসতে চায়, তাহলে লিখিত ভাবে জানালে বিভিন্ন স্থানে তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। তারা যদি চায়, প্রধানমন্ত্রীর আশ্রায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে শহরের বাহিরে যে কোন এলাকায় তাদেরকে ঘর তৈরী করে দেয়া হবে।

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন