শুক্রবার, ১২ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ২৮শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

পরচুলার রপ্তানি বেড়েছে ১০ গুণ

পরচুলার রপ্তানি বেড়েছে ১০ গুণ

নীলফামারীর গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠেছে কারখানা

  • স্বাবলম্বী হচ্ছেন গ্রামের নারীরা
  • আয় দেড় বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে

চুল আঁচড়ানোর পর উঠে যাওয়া চুল কিংবা সেলুনের ফেলে দেওয়া চুলও এখন ফেলনা নয়। ফেলনা এ চুলের দামও একেবারে মন্দ নয়। এ চুলই কয়েক হাত বদল হয়ে যায় কারখানায়। তৈরি হয় পরচুলা। দেশের সীমানা পেরিয়ে যায় ইউরোপ-আমেরিকা। খুব বেশি না হলেও প্রতিবছর বৈদেশিক মুদ্রা আমদানিতে এ ফেলনা চুলেরও রয়েছে অংশগ্রহণ। দশ বছরে রপ্তানি বেড়েছে ১০ গুণেরও বেশি। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে লকডাউনের জেরে প্রাথমিকভাবে চুলের ঘাটতি দেখা দেয় বিশ্ববাজারে। যা হু হু করে দাম বেড়ে গেলেও চাহিদা কমেনি। পরচুলার প্রচণ্ড চাহিদার কারণে নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেডের গণ্ডি পেরিয়ে গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠেছে পরচুলা তৈরির শতশত কারখানা। সঙ্গে বেড়েছে কর্মসংস্থানও। গ্রামের মহিলাদের বড় একটি অংশ এ কাজে যুক্ত । আয় হয়, মাসে ৮ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুসারে, অপ্রচলিত এ পণ্যটি রপ্তানি করে প্রথমবার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আসে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে। ওই সময় পরচুলা রপ্তানি করে ১ কোটি ১৪ লাখ মার্কিন ডলার আয় করেন উদ্যোক্তারা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পরচুলা রপ্তানি করে আয় হয় ১ কোটি ৯৫ লাখ ৫৮ হাজার ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২ কোটি ৩০ লাখ ডলার, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩ কোটি ২৫ লাখ ডলারে দ্বারায়। করোনার মধ্যেও ২০২০-২১ অর্থবছরে পরচুলা রপ্তানি এক লাফে বেড়ে ৫ কোটি ৭১ লাখ ডলার হয়, ২০২১-২২ অর্থবছরে তা পৌঁছায় ১০ কোটি ৫৮ লাখ ডলারে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ছিল প্রায় সাড়ে ৬৫ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ দশ বছরে রপ্তানি বেড়েছে ১০ গুণেরও বেশি।

এ পরচুলা ঘিরে উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী জেলার শহর ও গ্রাম এলাকাজুড়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরচুলা তৈরির কারখানাগুলো অসংখ্য নারীদের অর্থনৈকিভাবে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়কের ভূমিকা রাখছে। এখন নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দিন শেষ। আশ্বিণ-কার্তিকের সেই মঙ্গা বা অভাব নেই। এক সময়ের অভাবি পরিবারগুলোর ঘরে বিদ্যুতের আলো জ্বলছে। শোভা পাচ্ছে রঙিন টেলিভিশন ও সিলিং ফ্যান। তাদের হাতের তৈরি পরচুলা যাচ্ছে দেশের গন্ডি ছেড়ে বিদেশে।

আরও পড়ুনঃ  আন্তর্জাতিক নারী উদ্যোক্তা সম্মেলন নভেম্বরে

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চীন, কোরিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও ইউরোপের দেশগুলোতে উইগ বা পরচুলার প্রচুর চাহিদা রয়েছে। বিভিন্ন অসুস্থাজনিত কারণে যাদের মাথার চুল পড়ে যায় তারাসহ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিজ উইগের বড় ক্রেতা। হ্যালোইন, ক্লাউন, ক্যারিবিয়ান প্যারেড, সাম্বা ড্যান্সসহ বিভিন্ন উৎসবে যায় বাংলাদেশের পরচুলা। বলা যেতে পারে এসব দেশে প্রতিনিয়ত বাড়ছে চুলের ক্যাপের বাজার। লাভজনক হওয়ায় উদ্যোক্তারা ঝুঁকছেন পরচুলা তৈরির দিকেও। এরই ধারাবাহিকতায় উত্তরের নীলফামারী জেলার গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠেছে পরচুলা তৈরির কারখানা। মান স¤পন্ন কাজ, উৎপাদন খরচ কম এবং কম মূল্যে আমদানি করতে পারতে পারছে চীন ও জাপানসহ ৩০টি দেশের ব্যবসায়ীরা। ফলে নীলফামারী থেকে চুলের ক্যাপ রপ্তানি হচ্ছে। এসব কারখানায় হয়েক হাজার নারী কাজ করছেন। উদ্যোক্তারা বলছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে গ্রামে গ্রামে কারখানা আরও বাড়বে পাশাপাশি এ কারখানাগুলোতে অন্তত ৫ লাখ নারীর কর্মসংস্থান হবে।

সূত্রমতে, প্রতি বছরে সারা বিশ্বে প্রায় সাড়ে তিন কোটি পরচুলা (উইগ) রপ্তানি হয়ে থাকে নীলফামারীর এভারগ্রিন নামে হংকংভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। বর্তমানে সেখানে ৩৬ হাজার নারী কাজ করছে। তবে, বিশ্বে পরচুলার চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় সেই চাহিদা পূরনে নীলফামারী জেলা সদরের ইটাখোলা, কচুকাটা, টুপির মোড়, গোড়গ্রাম, পলাশবাড়ি, ডোমার ও সৈয়দপুরের এলাকাসহ ডিমলা উপজেলার তিস্তা নদী বিধৌত এলাকায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরচুলা তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে।

এলাকার নারীরা এভারগ্রিনের মাধ্যমে সাব কন্ট্রাক নিয়ে বেকার নারীদের কর্মসংস্থানের পথ দেখিয়েছে। গ্রাম এলাকায় এসব নারীরা বাড়ির পাশের কারখানায় কাজ করে নিজেদের স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলছেন।

নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সদর ইউনিয়নের জেলেপাড়া এলাকার পরচুলা কারখানায় দেখা যায় সেখানেও কাজ করছে প্রচুর নারী।

রুমানা হক জানান, এখানকার নারী শ্রমিকদের দুজন সুপারভাইজারের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজ শেখানো হয়। তারা ৭ দিনেই সব শিখে যায়। এখন এ সকল গ্রামের নারীরা সহজেই পরচুলা তৈরি করতে পারছেন।

আরও পড়ুনঃ  সুনামগঞ্জের মধ্যনগরে বৃক্ষরোপন কর্মসূচী পালন

নারী উদ্যোক্তা রত্না জানান, এখানে চুলের ছোটক্যাপ তৈরি করলে একজন শ্রমিক পাচ্ছেন ৩শ টাকা করে। আর বড় ক্যাপে ১ হাজার টাকা।

আরিফ মাহমুদ নামের এক উদ্যোক্তা বলেন, কারখানাগুলোতে পরচুলাসহ নানান পণ্য উৎপাদন করা হয়। একটি ছোট পরচুলা তৈরি করতে সময় লাগে দুই থেকে চারদিন। মানুষের চুল সংগ্রহ করে চীন, কোরিয়া থেকে সিনথেটিক ফাইবার এনে পরচুলার ক্যাপ তৈরি করা হয়। এসব ক্যাপ রপ্তানি করা হয় বিশ্বের ৩০টির বেশি দেশে।

তিনি আরও বলেন, করোনায় চীনের অনেক পরচুলা কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে আমাদের অর্ডার বেড়েছে। ওই উদ্যোক্তা জানান, সম্প্রতি বেশকিছু ছোট কারখানাও গড়ে উঠেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

জানা যায়, নীলফামারীর গ্রামের কারখানাগুলোতে কাজ করছে প্রায় ২০ হাজার নারী শ্রমিক। একেক জন ৮ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন মাসে। কাজ পেয়েছেন ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীরাও। চীনারা আমাদের এ অঞ্চল থেকে ব্যাপক পরচুলা ক্রয় করছে।

উদ্যোক্তারা বলেন, ফেরিওয়ালারা বাসাবাড়ির মা-খালাদের কাছ থেকে প্লাস্টিক পণ্য, খেলনা কিংবা খাবারের বিনিময়ে চুল সংগ্রহ করেন। গুচ্ছপ্রতি চুল সংগ্রহ করতে ফেরিওয়ালাদের ১০ থেকে ২০ টাকা খরচ হয়। প্রতি কেজি চুল বিভিন্ন হাত ঘুরে প্রক্রিয়াজাতকরণে আসে। প্রতি কেজি চুল সংগ্রহ করতে কারখানাগুলোর খরচ হয় এক থেকে দেড় হাজার টাকা।

সৈয়দপুর উপজেলার কাশিরাম বেলপুকুর, কামারপুকুর ও নেজামের চৌপথী সহ ৫টি ইউনিয়নের গ্রামে এলাকায় গড়ে উঠেছে ছোট্ট পরিসরে কয়েকটি পরচুলা তৈরির কারখানা। সংসারের কাজ করেও গৃহিণীরা কারখানাগুলোতে পরচুলা তৈরি করছেন।

বুলবুলি বেগম (৫৫)। স্বামী মারা গেছেন অনেক আগে। ছেলের সংসারে থাকেন। নিজের হাত খরচ যোগাতে দলবদ্ধ হয়ে তিনিও পরচুলা কারখানায় কাজ করছেন। তিনি বলেন, ছেলের সংসারে খেয়ে দিন চলে। নিজের অনেক প্রয়োজনীয় খরচ রয়েছে। প্রতিবেশীর বাড়িতে চুলের কাজ হচ্ছে ছয় মাস থেকে। সেখানে ঢুকে কাজ করছি।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এর উপ-মহাব্যবস্থাপক হুসনে আরা বেগম বলেন, কেউ আর এখন শুধু গৃহিণী থাকতে চান না। গ্রামে ঘুরলে দেখা যাবে নারীদের ক্ষুদ্র নানা কাজে অংশগ্রহণের চিত্র। নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ফলে অর্থনীতির চাকা মজবুত হচ্ছে এ অঞ্চলের। ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন নারীরা। নারীদের মধ্য থেকে উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে, তারা কর্মক্ষেত্র তৈরি করছেন। এর ফলে নারীরা যেমন সমৃদ্ধ হচ্ছেন তেমনি সংসারে সক্ষমতা বাড়ছে।

আরও পড়ুনঃ  মোল্লাহাটে কৃষকদের মাঝে বীজ ও সার বিতরণ

তিনি বলেন, নীলফামারীতে গ্রামে গ্রামে পরচুলা তৈরির ফ্যাক্টরি হওয়ায় এলাকায় একটা পরিবর্তন এসেছে। এখানে কাজ করে অনেক নারী সংসারের অভাব ঘুচিয়েছেন। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাচ্ছেন। নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ততা বেড়েছে। যারা কাজ করেন তারা সবাই নারী। তাদের সংসারে উন্নতির পরিবর্তন এসেছে। গ্রামের নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকাশে বিসিক নানাভাবে পাশে রয়েছে এবং সহযোগিতা করছে।

বাংলাদেশ হেয়ার প্রোডাক্টস প্রসেসরস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক আবুল কালাম বলেন, পরচুলা রপ্তানিতে আমরা প্রতি বছর ভালো করছি। ইপিজেডগুলোতে বিদেশি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করেছেন। ২০টির বেশি ফ্যাক্টরি আছে চায়নিজ, হংকং, কোরিয়ানদের। এর বাইরে বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট শতাধিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা।

তিনি আরও জানান, নীলফামারী, দিনাজপুর,যশোর, খুলনা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, নড়াইল, রাজশাহী, নওগাঁ, চট্টগ্রাম, সৈয়দপুর, রংপুর, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, কক্সবাজার, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় চুল বেচাকেনা হয়। প্রক্রিয়াজাত চুল ও চুলের টুপি বা উইগ দুইভাবে রপ্তানি হয়। এক সময় শুধু বিদেশে রপ্তানি হলেও এখন দেশেও পরচুলার কদর বেড়েছে।

বেপজার জনসংযোগ বিভাগ থেকে জানা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় উইগ কারখানার একটি বাংলাদেশে আছে। চারটি বড় পরচুলা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের কারখানা রয়েছে এখানে। নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেডে রয়েছে এভারগ্রিণ প্রোডাক্টস। যেখানে প্রায় ৩৬ হাজার কর্মী কাজ করে। ঈশ্বরদীতে এমজেএল বাংলাদেশ লিমিটেড ও মোংলায় আছে ওয়াইসিএল ইন্টারন্যাশনাল ইন্ডাস্ট্রি। ইপিজেডগুলো নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা)। সূত্রমতে, বাংলাদেশে পরচুলা সম্ভাবনাময় খাত হয়ে উঠছে। দিন দিন রপ্তানিও বাড়ছে। বড় কোনো বাধা না পেলে এ খাত থেকে আয় দেড় বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন