মঙ্গলবার, ১৬ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১লা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বকশিস বাণিজ্যে হাসপাতাল

বকশিস বাণিজ্যে হাসপাতাল

বকশিস সিন্ডিকেটে অসহায় রোগী। অসহায় তাদের স্বজন। জন্ম থেকে মৃত্যু কোথায় নেই বকসিস। নবজাতককে যেমন কোলে নিতে হলে মাকে দিতে হয় বকসিস, ঠিক তেমনি মৃতদেহ নামাতেও দিতে হয় উৎকোচ। দিশেহারা স্বজনদের কান্নায়ও মন গলে না তাদের। রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতাল পুরোটাই এখন এসব দালালের দখলে। এদের কাছে অসহায় কর্তৃপক্ষ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুরো মেডিকেল জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অন্তত ২৫০ দালাল। দালল নামক এই সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হাসপাতালটি। অবস্থা এমন পর্যায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে, বকশিস না পেলে রোগীর স্বজনদের উপর চড়াও হওয়া থেকে শুরু করে মারধরের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, হাসপাতালের কর্মী না হলেও বিভিন্ন ওয়ার্ডে অবাধে ঘুরে বেড়ান তারা। রোগী-স্বজনদের কাছে নিজেদের হাসপাতালের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন, হয়রানি করেন। চিকিৎসক-সেবিকারা পর্যন্ত তাদের দাপটে তটস্থ থাকেন। ২৫০ দালালের হাতে কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

অভিযোগ রয়েছে, দালালদের সঙ্গে হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারীর সখ্যতা রয়েছে। দালাল চক্রের সঙ্গে যোগসাজশ ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে সম্প্রতি একজন ওয়ার্ড মাস্টারকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে কর্তৃপক্ষ।

কয়েকদিন আগে ফেসবুকে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। সেখানে দেখা যায়, তিনজন কর্মচারী এসেছেন এক কর্মকর্তার কাছ থেকে বকশিস নিতে। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকের কাছে বকশিস দাবি করছেন চুক্তিভিত্তিক সিন্ডিকেটের কয়েকজন কর্মচারী। এতে বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হন চিকিৎসক এ.বি.এম রাশেদুল আমীর। তিনি রমেক হাসপাতালের অর্থোসার্জারি বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট। এ ঘটনা প্রসঙ্গে  হাসপাতালের পরিচালক বরাবর গত ১৮ সেপ্টেম্বর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন রাশেদুল।

আরও পড়ুনঃ  মালয়েশিয়ান উপকূলে আড়াইশ রোহিঙ্গাসহ নৌকা আটক

লিখিত অভিযোগে রাশেদুল আমীর বলেন, গত ১৭ সেপ্টেম্বর তার মা হৃদরোগে আক্রান্ত হলে হাসপাতালে ভর্তি করাতে জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন স্বজনরা। জরুরি বিভাগে ভর্তির জন্য ২৫০ টাকা দাবি করা হয়। পরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মা পরিচয় জানতে পেরে তারা ৫০ টাকা ভর্তি বাবদ নেন। যদিও হাসপাতালে নির্ধারিত ভর্তি ফি ২৫ টাকা এবং সরকারি কর্মকর্তার মা এবং অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রী হিসাবে ভর্তি ফি না নেওয়ার কথা।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ভর্তি পরবর্তী সিসিইউতে অসুস্থ মাকে নেওয়া হলে সেখানে জরুরি বিভাগে কর্মরত দুজন জোরপূর্বক তার ব্যক্তিগত সহকারীর কাছ থেকে ২০০ টাকা বকশিস নেন। এসময় তাদের আমার নাম পরিচয় এবং রোগী সম্পর্কে জানানো হলে তারা বলে ‘যে স্যারের মা হোক টাকা দিতে হবে’। পরবর্তীতে আমি রাতে আসার পর মায়ের শয্যা পাশে অবস্থানকালে সিসিইউতে কর্মরত ওয়ার্ড বয় পরিচয়ধারী মাসুদ আমার কাছে সরাসরি টাকা দাবি করে। এসময় আমি সেই কথাবার্তার কিছু মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করি।

রাশেদুল আমীর বলেন, এই ঘটনা আমার কাছে অত্যন্ত মানসিক পীড়াদায়ক এবং অপমানকর। যে প্রতিষ্ঠানে আমি সেবা দিয়ে যাচ্ছি, সেখানে আমি হয়রানির শিকার হচ্ছি তা সত্যি দুঃখজনক। আমি নিজে হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা হয়েও যদি হয়রানির শিকার হই, তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা তো সহজেই অনুমেয়।

রমেক হাসপাতালের পরিচালককে ছাড়াও স্থানীয় সংসদ সদস্য, সিটি মেয়র, রমেক অধ্যক্ষ, জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপার বরাবর এ অভিযোগ পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

আরও পড়ুনঃ  গাজীপুরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের আর্থিক সহায়তার চেক প্রদান

এ বিষয়ে রমেক পরিচালক ডা. শরীফুল হাসান বলেন, অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগকারী চিকিৎসক এবং যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তাদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে ওয়ার্ডবয় মাসুদকে শাস্তির আওতায় আনা হবে। 

দালালদের দৌরাত্ম্যের কথা স্বীকার পরিচালক বলেন, দালালদের দাপটে শুধু রোগী-স্বজনদের নিরাপত্তাই বিঘ্নিত হচ্ছে না, চিকিৎসকেরাও জিম্মি হয়ে পড়েছেন। আমরা চেষ্টা করছি হাসপাতালকে দালালমুক্ত করতে। এ জন্য চিকিৎসক-কর্মচারীদের যৌথ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, দালালদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট আনিছুর রহমানকে মারধর করা হয়। এ সময় দালালদের সঙ্গে কয়েকজন কর্মচারীও ছিলেন। এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল কর্তৃপক্ষ। ওই কমিটি দালালদের উৎপাত বন্ধ ও হাসপাতালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাতজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে। এক হাজার শয্যার রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে রোগী ভর্তি থাকে প্রায় দুই হাজার। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে রোগীর সঙ্গে থাকেন স্বজনেরাও। তারা বলেন, কারা হাসপাতালের কর্মচারী আর কারা নয়, সে পরিচয় তাদের পক্ষে যাচাই করা সম্ভব হয় না।

দালালদের হয়রানির শিকার নীলফামারীর শিক্ষক আলী হোসেন বলেন, তার মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছিলেন। রোগীর জন্য কেনা ওষুধ তখন চুরি হয়েছিল। আরেক রোগীর স্বজন রফিকুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালের কর্মচারী পরিচয়ে ওষুধ কিনে এনে দেওয়ার কথা বলে এক ব্যক্তি তিন হাজার টাকা নিয়েছিলেন। পরে তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুনঃ  করোনায় শহরের ৬৯ ভাগ মানুষ খাবার কেনা কমিয়েছেন: বিশ্বব্যাংক

এদিকে কর্মচারী ইউনিয়ন ২৫০ দালালকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে এ মাসের প্রথম সপ্তাহে হাসপাতালের পরিচালককে চিঠি দিয়েছেন। এ ছাড়া ‘দালালমুক্ত হাসপাতাল গড়ে তুলতে সবার সহযোগিতা চাই’ এমন স্লোগান-সংবলিত পোস্টার হাসপাতালের বিভিন্ন দেয়ালে লাগানো হয়েছে। হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান বলেন, দালালদের উৎপাতে রোগীদের জিনিসপত্র খোয়া যাচ্ছে। তাঁরা ভুয়া কর্মচারী পরিচয়ে হাসপাতালকে জিম্মি করে ফেলছেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কর্মচারী ইউনিয়ন একজোট হয়েছে।

হাসপাতালে দালালদের তৎপরতার বিষয়ে কোতোয়ািল থানার ওসি মতিউর রহমান বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় অভিযান চালিয়ে পাঁচ দালালকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। দালালদের উৎপাত থেকে রোগী ও স্বজনদের রেহাই দিতে হাসপাতালে মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে।

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন