শুক্রবার, ২৬শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বাণিজ্য সম্প্রসারণ----

মরুররাজ্যে ছোট্ট বাংলাদেশ

মরুররাজ্যে ছোট্ট বাংলাদেশ
  • আরব আমিরাতে বাংলাদেশিদের ব্যাপক বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ
  • মরুরবুকে সবুজের রত্ন ফলাতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছেন বাংলাদেশি কর্মীরা

বাংলাদেশ সরকার উদ্যোগ নিলে মধ্যপ্রাচ্যে কাঁচাপণ্যের বাজারে রপ্তানি আরও বৃদ্ধি পাবে। আমিরাতের বাজারে দেশিয় ফল ও সবজির চাহিদার তুলনায় আমদানি অনেক কম: ওলি ভাণ্ডারী, বাংলাদেশি আড়ৎদার

সর্বোবৃহৎ ফল ও কাঁচা সবজির আড়ৎ ‘আল আওয়ির’ এ বাংলাদেশিদের স্বতঃস্ফূর্ত বিচরণ রয়েছে। এখানে কয়েক মিনিটের জন্য দাঁড়ালে প্রবাসীরা হয়তো ভুলে যান এটি ভিনদেশ

সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাণিজ্য রাজধানী দুবাই, ২১ শতকের গোড়ার দিকে জেলেপল্লী থেকে শহরটি বিশ্ব বাণিজ্য’র কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এর অন্যতম কারণ আরব ভূখণ্ডের মধ্যস্থল, যা এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকাকে একত্রিত করেছে। যাতায়াত, যোগাযোগব্যবস্থা এবং ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে এর থেকে সেরা স্থল বা নৌবন্দরের বিকল্প হতে পারে না। তার চেয়েও বড় কারণ তেল ও খনিজ সমৃদ্ধ আরব উপদ্বীপের আরব বণিকদের সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্যর সুসম্পর্ক গড়ে তোলাও এর অন্যতম মূল কারণ বলে মনে করে থাকেন ঐতিহাসিকগণ।

একসময় পৃথিবীর শাসন ক্ষমতা ছিলো আরবদের হাতে ‘খলিফা ওমর বিন খাত্তাব রা. ছিলেন অর্ধ পৃথিবীর শাসক’ তার সময়কালে আরব বণিকদল প্রায় পৃথিবীর বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতো, সময়ের পরিক্রমায় তা ইউরোপ কিংবা আমেরিকানদের হস্তগত হলেও খনিজসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যর গুরুত্ব কোনো অংশে কমে যায়নি। বিকল্পহীন বাণিজ্যক এক মহাযজ্ঞ গড়ে তুলে বিশ্বকে বুঝিয়েছেন দুবাইয়ের শাসক শেখ মুহাম্মদ বিন রাশিদ আল মাখতুম।

যদি শুনে থাকেন মরুর এ মহারাজ্যেও রয়েছে একটি বাংলাদেশ! বিষয়টা অস্বাভাবিক নয়। কারণ গত কয়েক দশক ধরে দেশটিতে বাংলাদেশিরা ব্যাপক বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে চলেছে। তারই প্রমাণ মিলে আরব আমিরাতের সর্বোবৃহৎ ফল ও কাঁচা সবজির আড়ৎ ‘আল আওয়ির’ এ বাংলাদেশিদের স্বতঃস্ফূর্ত বিচরণ। সেখানে কয়েক মিনিটের জন্য দাঁড়ালে প্রবাসীরা হয়তো ভুলে যান এটি ভিনদেশ। এখানে উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশি ব্যবসায়ি ও ৮০ ভাগ কর্মীদের দৈনিক মহাকর্মযজ্ঞে বাংলা মায়ের মধুর বুলি মৌমাছির ধ্বনিরমত মাতিয়ে রাখেন প্রবাসীরা।

আরও পড়ুনঃ  তেজগাঁওয়ে ট্রেনে ক্রেনের আঘাত: ঢাকার সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ

‘আল আওয়ির’ হলো দেশটির সর্বোবৃহৎ পাইকারি ও খুচরা বাজার, এখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সবজি ও ফল-মূল দেশটির সকল সুপার সপ, খুচরা দোকানসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাঁচাপণ্য এখান থেকে সর্বরাহ করা হয়ে থাকে। শুধু আমিরাতের জন্যই নয়, এটি মধ্যপ্রাচ্যর অন্যতম বাংলাদেশি অধ্যুষিত অঞ্চল।

আড়ৎটিতে বাংলাদেশি কাঁচা শাক-সবজি, ফল, মাছসহ বিভিন্ন দেশিয় মসলা এবং একাধিক পণ্য সহজলভ্য। এছাড়াও দেশটির অন্যতম আমদানিকৃত পণ্যগুলোর মধ্য উল্লেখযোগ্য দেশগুলো হলো- ভারত, পাকিস্তান, চায়না, মিশর, ইথুপিয়া, লেবানন, ইউক্রেন, রাশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ফল ও সবজি বিপণন করে থাকে। তবে এর মধ্য সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো দেশটির উম্ম আল-খোয়িন, রাস আল-খাইমা, আমিরাতের গ্রীনসিটি খ্যাত আল-আইন ও প্রতিবেশি দেশ ওমান স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সবজি বেশ জনপ্রিয় বলে জানায়, এখানকার বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা। আর মরুরবুকে সবুজের রত্ন ফলাতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছেন বাংলাদেশি কর্মীরা।

বাংলাদেশি প্রবীণ আড়ৎদার কুমিল্লার ওলি ভাণ্ডারী জানান, তিনি দীর্ঘ ১৪ বছর যাবৎ এখানে ফলের ব্যবসায় করে আসছেন। প্রথমে আরব ও অনারব ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করলেও বর্তমানে তিনি তার ভাই ও কয়েকজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী পার্টনার নিয়ে কয়েকটি দোকান পরিচালনা করেন। তিনি আরও বলেন, এখানে উল্লেখযোগ্য পণ্য আসে ভারত, পাকিস্তান, মিশর ও চীন থেকে। যদি সরকার উদ্যোগ নেয় মধ্যপ্রাচ্যর কাঁচাপণ্যর বাজারে রপ্তানির আরও বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে আমিরাতের বাজারে বাংলাদেশি ফল ও সবজির যে পরিমান চাহিদা রয়েছে তার তুলনায় অনেক কম আমদানি হয়। এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে ভারত, পাকিস্তান ও চীন, যদি  বাংলাদেশ রপ্তানি বৃদ্ধি করতে পারলে রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক রিজার্ভ বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ বাজার দখল করতে সক্ষম হবে।

আরও পড়ুনঃ  মে মাসেই নারী ও শিশু নির্যাতন বেড়েছে ৩১ শতাংশ

আড়ৎটিতে আমদানিকৃত ও স্থানীয়ভাবে চাষ হওয়া বাংলাদেশি সবজি সমূহের মধ্য উল্লেখযোগ্য হলো- আলু, পটল, মুলা, গাজর, ফুলকপি, শিম, বরবটি, টমেটো, মিষ্টিকুমড়া, মটর, ঢ়েড়স, ছোলা, লালশাক, পুইশাকসহ বিভিন্ন জাতের শাজ-সবজি।

‘আল আওয়ির’ ব্যবসায়ি ও কর্মীরা জানান, এখানে বাংলাদেশি অধ্যুষিত হওয়ায় যোগাগোগ ও ব্যবসায়ি কাজকে সহজ করতে আড়ৎদাররা দেশীয়দের কাজে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। এছাড়াও দীর্ঘ সময় বাংলাদেশির ভিসা বন্ধ থাকার পর বর্তমানে ভিসা চালু হওয়ায় সরাসরি কর্মী ভিসা বা ভিজিট ভিসায় আগত বাংলাদেশিদের নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। এতে নতুন কর্মীদের দিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ করছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন এখানকার প্রবাসীরা।

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন