শনিবার, ১৩ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ২৯শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

শয্যার চেয়ে রোগী ৫ গুণ বেশি

শয্যার চেয়ে রোগী ৫ গুণ বেশি

নওগাঁয় ডায়রিয়ার প্রকোপ-

নওগাঁয় হঠাৎ করে ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা দিয়েছে। জেলার প্রধান সরকারি হাসপাতালে ধারণক্ষমতার চেয়ে পাঁচ গুণেরও বেশি রোগী ভর্তি রয়েছে। শয্যা খালি না থাকায় মেঝেতেই রেখে রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। খরচের চিন্তায় ডায়রিয়া আক্রান্ত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের রোগীরাই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে বেশিরভাগই শিশু ও কিশোর।

শনিবার বিকেল পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে রোগি ভর্তি হয়েছে ২৩ জন। মোট রোগী ভর্তি ৭০ জন। গত শুক্রবার বেলা ১১ টা পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের শিশু, মহিলা ও পুরুষ ওয়ার্ডে ৩০ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়। গত  বৃহস্পতিবার বিকেল ভর্তি হয় ৯৫ জন। বুধবার ২৪ ঘণ্টায় এ হাসপাতালে ডায়রিয়া আক্রান্ত ১৬৮ জন রোগী ভর্তি হয়। এছাড়াও জেলার ১০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৬০ জন ডায়রিয়া রোগী ভর্তি হয়েছে।

নওগাঁ সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, হাসপাতালের শিশু, মহিলা ও পুরুষ ওয়ার্ডে ডায়রিয়া রোগীদের জন্য ১০টি করে মোট ৩০ শয্যা নির্ধারিত আছে। ঈদের দিন থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৫০ জনের বেশি ডায়রিয়া রোগী ভর্তি থাকছেন। শুক্রবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ৩০ শয্যার বিপরীতে ১৪০ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। গত ৭ দিনে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ৭৩৫ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। ২৮ এপ্রিল ৫৯ জন, ২৯ এপ্রিল ৭০ জন, ৩০ এপ্রিল ৭৬ জন, ১ মে ৮২ জন, ২ মে ১২৬ জন, ৩ মে ১৪৬ জন ও ৪ মে ১৬৮ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।

আরও পড়ুনঃ  ভারতের হাসপাতালে আটকা পাইকাগাছার শিশু

হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা বলছেন, তীব্র গরমের কারণে গত এক মাস ধরেই হাসপাতালে শয্যার চেয়ে অধিক সংখ্যক ডায়রিয়া রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। তবে  ঈদের আগের দিন (গত সোমবার) থেকে ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়ে গেছে। আগে যেখানে গড়ে ৪৫ থেকে ৫০ জন রোগী চিকিৎসা নিতেন এখন সেখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫০ জন ডায়রিয়া রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। তীব্র গরম, খাবারের ক্ষেত্রে অসর্তকতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার কারণে ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েছে বলে মনে করছেন তাঁরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের চারতলায় শিশু ওয়ার্ডে ডায়রিয়া রোগীতে ঠাসা। ওয়ার্ডটিতে ডায়রিয়া রোগীর জন্য নির্ধারিত শয্যা সংখ্যা ১০টি হলেও দুপুর পর্যন্ত ৩০ জন ভর্তি ছিল। শয্যা না থাকায় একেই বেডে দুইজন-তিনজন শিশুকে রাখা হয়েছে। তাতেই শয্যা সংকুলান না হওয়ায় কেউ কেউ মেঝেতে বিছানা পেতে ঠাঁই নিয়ে শিশুদের চিকিৎসা করাচ্ছেন। একই চিত্র পাঁচতলায় মহিলা ওয়ার্ড ও ছয়তলায় পুরুষ ওয়ার্ডে। ওয়ার্ডগুলোতে ভর্তি হওয়া প্রায় অর্ধেক রোগীই ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন। শয্যা না থাকায় অধিকাংশ রোগী মেঝেতে বিছানা পেতে ঠাঁই নিয়েছেন।

নওগাঁ শহরের আরজি-নওগাঁ এলাকার বাসিন্দা সাবিনা ইয়াসমিন পাঁচ বছরের মেয়েকে নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘মেয়েটার অসুখের কারণে আমাদের ঈদের আনন্দই মাটি হয়ে গেছে। রাতের আগের দিন সন্ধ্যায় জেদের কারণে ওর বাবা শহরের একটা কনফেকশনারি থেকে ওকে বার্গার কিনে খাওয়ায়। ওই খাবার খাওয়ার পর থেকেই ওর খারাপ লাগা শুরু হয়। ওই রাত থেকেই ডায়রিয়া শুরু হয়। খাবার স্যালাইন ও ওষুধ খাওয়ানোর পরেই ভালো না হওয়ায় ঈদের দিন বিকেলে মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করাই। শয্যা না থাকায় মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা করাতে হচ্ছে।’

আরও পড়ুনঃ  করোনা ভ্যাকসিন আবিষ্কারে অক্সফোর্ডে দুই বাঙালিকন্যা

নওগাঁ সদর উপজেলার বর্ষাইল এলাকার নজরুল ইসলাম ডায়রিয়ায় আক্রান্ত গতকাল বুধবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গত মঙ্গলবার থেকে তিনি অসুস্থ। জাহানারা বেগম নামের আরেক নারী তাঁর দুই বছর বয়সী শিশুসন্তানকে ভর্তি করিয়েছেন। জাহানারা বলেন, ঈদের আগের দিন থেকে তাঁর সন্তানকে স্যালাইন ও ওষুধ খাওয়ানো হচ্ছিল। কিন্তু কোনো উন্নতি নেই। শরীর বেশি খারাপ হওয়ায় আজ সকালে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন।

হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের নার্স ইনচার্জ মৌসুমী খাতুন বলেন, গত তিন-চার দিন ধরে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়েছে। রোগীদের সামলাতে গিয়ে নিজেদের অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে যে সব শিশু ভর্তি হয়েছে তাদের বেশির ভাগই পিৎজা, বার্গারসহ বিভিন্ন ফাস্ট ফুড খেয়ে অসুস্থ হয়েছে বলে স্বজনরা বলছেন।

পুরুষ ওয়ার্ডের নার্স ইনচার্জ শারমিন আক্তার বলেন, পুরুষ ওয়ার্ডে মেডিসিন, সার্জারী ও কার্ডিওলজী বিভাগে মোট শয্যা সংখ্যা ২৫টি। তবে রোগী ভর্তি আছেন ৯৪ জন। মেডিসিন ওয়ার্ডে ১৫টি শয্যা থাকলেও রোগী ভর্তি আছেন ৬৮ জন। এর মধ্যে ৪২ জনই ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী। ঈদে অনিয়ন্ত্রতভাবে খাবার খাওয়ায় হঠাৎ করে ডায়রিয়া সমস্যাটা বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে। প্রতি ঈদেই ডায়রিয়া রোগীর চাপ থাকে। তবে এবার সংখ্যাটা অনেক বেশি।

নওগাঁ সদর হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. তৌফিকুর রহমান বলেন, একদিকে গরম, আরেক দিকে এক মাস রোজা রাখার পর হঠাৎ করে অনিয়ন্ত্রিতভাবে খাবার খাওয়ার কারণে মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। ডায়রিয়া মূলত পানি ও খাদ্যবাহিত রোগ। স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খেতে হবে সবাইকে। হাত সব সময় জীবানুমুক্ত রাখতে হবে।

আরও পড়ুনঃ  করোনায় আরও ৯৪ জনের মৃত্যু

নওগাঁ সদর আধুনিক হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জাহিদ নজরুল বলেন, রোগীর চাপ সব সময় থাকে। শয্যাসংকটও থাকে। তবে হঠাৎ করে ডায়রিয়া রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ার কারণে শয্যাসংকট আরও তীব্র হয়েছে। তবে ওষুধ সরবরাহসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে। রোগীরা এসে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন।

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন