শুক্রবার, ১২ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ২৮শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

দাম কমে শুধু শ্রমিকের

মহান মে দিবস আজ

  • সমান কাজ করেও নারীদের মজুরি কম

শাহিনুর বেগম ময়লার গাড়ির মধ্যে দাঁড়িয়েও দেদারছে হাসিমুখে কাজ করে যাচ্ছেন। সঙ্গে ১২ বছরের ছেলেটিও তাকে সহায়তা করছে ময়লাব্যবস্থাপনায়। অর্থাৎ ময়লা থেকে পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, অন্যান্য জিনিস আলাদাকরণে। ধানমন্ডিতে তাদের সঙ্গে কথা হয়।

শাহিনুরের সঙ্গে ওসমান ও বাবুও কাজ করেন। ওসমান ও বাবু মূলত ময়লার গাড়ি টেনে নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে নিয়ে যান। আবার বাসা-বাড়ি থেকে ময়লাও সংগ্রহ করেন। ময়লাতে দাঁড়িয়ে কাজ করছেন অথচ নামে কোন কাপড় নেই দুর্গন্ধ লাগে না এমন প্রশ্নে শাহিনুর বলেন, আমাদের জীবনটাই দুর্গন্ধে ভরা। তিনজনে এক মাস কাজ করে ১২ হাজার টাকা বেতন পাই। আর ময়লাতে থাকা পলিথিন, প্লাস্টিকজাতীয় জিনিস বিক্রি করে আরো ৩ হাজার টাকার মতো আয় হয়। এটি দিয়েই আমাদের তিনটি পরিবার চালাতে হয়। থাকি রায়েরবাজারে। সারাদিন কাজ করি। রাত ১০টায় বাসায় ফিরি। ময়লা-আবর্জনা আমাদের জীবন। গন্ধই কি আর ঘ্রাণই কি। ১২ হাজার টাকাকে তিন ভাগ করলে ৪ হাজার টাকা করে পড়ে। তাতে দৈনিক ১৩৩ টাকা পড়ে ভাগে। এটি মাসিক বেতন।

বাবু বলেন, আমরা এক্সিডেন্ট করে মরলেও কোম্পানি কোন ক্ষতিপূরণ দেয় না। এভাবেই চলছে জীবন। সুঠাম দেহের লাজুক ওসমান বলেন, একটা কাজ পাইছি এইটাই অনেক। সকাল ১০ থেকে রাত ১০টা পযৃন্ত ময়লায় ডুবে থাকি। গন্ধ আর গন্ধ লাগে না। সব সয়ে গেছে।

পরিবাগের ঢালে দেখা হয় সত্তরোর্ধ্ব লুৎফুর রহমান ও সাঈদুল ইসলামের সঙ্গে। লুৎফুরের বাড়ি ফরিদপুরের ভাঙা থানায়। তিনি রিকশা চালান। বিশ্রাম করছিলেন একটি ইটের ওপর বসে। বয়স্কভাতা পান কিনা এমন প্রশ্নে বলেন, গ্রামের ৭ হাজার টাকা চাইছে। সবশেষে ৪ হাজার এসে ঠেকছে। এই টাকা দিলে সে বয়স্কভাতার কার্ড করে দিবে কিন্তু আমি ঘুষ দিয়ে কার্ড নেওয়ার পক্ষে না। পরে আর কার্ড পাইনি জানান লুৎফর।

আরও পড়ুনঃ  জমজমাট নজরুল জন্মজয়ন্তী মেলা

এ সময় পাসেই বসে ছিলেন সাঈদুল ইসলাম। তার বাড়ি বরিশালের কাউনিয়া থানায়। তিনি বলেন, রথ থাকা পর্যন্ত কাম (কাজ) কইরা খাইমু থাইলেও ঘুষ দিমু না কার্ডের জন্য। আপনার কাছেও ঘুষ চেয়েছে? এই প্রশ্নে সাঈদুল বলেন, ৪ হাজার টাকা ঘুষ চাইছে মেম্বর। আমি বাবা ঘুষ দেওয়ার মানুষ না, তাই কার্ডও পাইনি। এই গরমের মধ্যে রিকসা নিয়ে বাইর হইছি। যা রাখছে আল্লাহ ভাগ্যে। দিন আয়-ব্যয় কত জানতে চাইলে বলেন, ৪ থেকে ৫শ টাকা ভাড়া মারতে পারি। সেখানে ১০০ টাকা জমা দেই যা থাকে তা নিয়ে কোন রকম দিন-রাত চলে যাচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটপাতে কথা হয় আব্দুল মজিদের সঙ্গে। তার বাড়ি নীলফামারীর জলঢাকা থানায়। আমির কাছাকাছি বয়স। ২১ হাজার টাকা ঋণ করে পেটে অপারেশন করিয়েছেন। বাড়িতে থাকতে অন্যে জমিতে বর্গাচাষ করতেন। মাঝে মাঝে কিছু কাজও করতেন। এখন বয়স হয়েছে কাজ করতে পারেন না। হাত পাততে রাজধানীতে এসেছেন। থাকেন স্টেডিয়ামের আশপাশে। তিনি বলেন, মেম্বার ৪ হাজার টাকা নিছে। অনেক ঘোরাঘুরি করলাম কার্ড পেলাম না। মেম্বার মইরা গেছে। মেট্রোরেলের তদারকিতে কাজ করেন এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে আলাপকালে জানান, তার বাড়ি টাঙ্গাইলে প্রতি মাসে তারা ১২ থেকে ১৬ হাজার টাকা বেতন পান।

শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিদাওয়া আর শোষণ-বঞ্চনার শেষ নেই এখনো। পেটের দায়ে সামান্য মজুরিতেও কাজ করে যান শ্রমজীবী নারী-পুরুষেরা। পাথর ভাঙার কলে পুরুষদের সঙ্গে হাড়ভাঙা পরিশ্রমে নারী শ্রমিক। দিন শেষে পারিশ্রমিক পাবেন ২৫০ টাকা। বগুড়া সদর উপজেলার বাঘোপাড়া এলাকায় মাটি কাটার কাজ করেন একদল নারীশ্রমিক। প্রত্যেক নারীশ্রমিক সারাদিন মাটি কাটার কাজ করে মজুরি পান ১১০ থেকে ১২০ টাকা। এভাবে মজুরি-বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তাঁরা। ঢাকার কেরানীগঞ্জের কালীগঞ্জে আগুনের প্রচণ্ড তাপে পুরোনো লোহা গলিয়ে ছোট-বড় যন্ত্রাংশ তৈরি করেন কিছু শ্রমিক। তাঁদের মাসিক বেতন ৭ থেকে ১২ হাজার টাকা।

আরও পড়ুনঃ  পরিত্যক্ত সেই দশ ভবন ভাঙায় অনিয়ম

এটিই হচ্ছে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের আয়-ব্যয়। আর পোশাকখাতের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা সামান্য কিছু বেশি। অথচ এসব বৈষম্য দূর করতেই ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা দৈনিক আট ঘণ্টার কাজের দাবিতে আন্দোলন করে জীবন দিয়েছিল। তাদের ঘিরে থাকা পুলিশের প্রতি এক অজ্ঞাতনামার বোমা নিক্ষেপের পর পুলিশ শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। তাতে ১০-১২ জন শ্রমিক ও পুলিশ নিহত হয়। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে থেকে শিকাগো প্রতিবাদের বার্ষিকী আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশে পালনের প্রস্তাব করেন রেমন্ড লাভিনে। ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। এর পরপরই ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে মে দিবসের দাঙ্গার ঘটনা ঘটে।

১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে আমস্টারডাম শহরে অনুষ্ঠিত সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই উপলক্ষ্যে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবে দৈনিক আটঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণের দাবি আদায়ের জন্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বজুড়ে পয়লা মে তারিখে মিছিল ও শোভাযাত্রা আয়োজন করতে সকল সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল এবং শ্রমিক সংঘের (ট্রেড ইউনিয়ন) প্রতি আহ্বান জানানো হয়। সেই সম্মেলনে শ্রমিকদের হতাহতের সম্ভাবনা না থাকলে বিশ্বজুড়ে সকল শ্রমিক সংগঠন মে মাসের ১ তারিখে বাধ্যতামূলকভাবে কাজ না-করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অনেক দেশে শ্রমজীবী জনতা মে মাসের ১ তারিখকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালনের দাবি জানায় এবং অনেক দেশেই এটা কার্যকর হয়। বাংলাদেশ এবং ভারতেও এই দিনটি যথাযথভাবে পালিত হয়ে আসছে। ভারতে প্রথম মে দিবস পালিত হয় ১৯২৩ সালে। মে দিবস আসে, মে দিবস যায় কিন্তু শ্রমিকদের শ্রম ও কর্মঘণ্টা ও বেতন বৈষম্য কমেনি।

আরও পড়ুনঃ  ইন্টারনেটের গতি কমতে পারে আজ থেকে

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেভার স্টাডিজ-বিলস এর এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের মেম্বার ও বাংলাদেশ লেভার ফেডারেশনের জেনারেল সেক্রেটারি মো. শাকিল আক্তার চৌধুরী দৈনিক আনন্দবাজারকে বলেন, মে দিবসের দাবি আজো বাস্তবায়ন হয়নি। কারণ যে দাবি ও বৈষম্য নিরসনের জন্য ১৩৬ বছর আগে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তা পুরোপুরি সমাধান হয়নি। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র, মালিকপক্ষ ও অন্যান্য কর্মকর্তারা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছে না। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও কর্মঘণ্টা আজো ঠিক হয়নি। কাজ করেও সময়মতো মজুরি পায় না। আহত-নিহত হলেও তার পরিবার প্রাপ্য অর্থ পায় না। সবমিলে বলা যায় অনেক ঘাটতি এখনো আছে। তিনি অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজকেও শ্রম আইনে নিয়ে আসার আহ্বান জানান। বলেন, শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া আদায়টিকে অন্ধকার রাতে পথ দেখানো জোনাকির আলোর সাথে তুলনা করা যেতে পারে। এটি পুরোপুরি কোনো সাফল্য নয়। কিছুটা পথ দেখানো মাত্র। আজ পহেলা মে তথা শ্রমিক দিবসে এই শ্রমিকনেতা শ্রম সেক্টরে সকল ধরনের বৈষম্যের অবসান কামনা।

Print Friendly, PDF & Email

সংবাদটি শেয়ার করুন